বাংলাদেশ ব্যাংকের গোপন পরিদর্শন
সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ৪০ ব্যাংকের অসংগতি
- ক্রেতা সেজে কিনতে গিয়ে প্রমাণ পেলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তারা

গ্রাহক সেজে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকটি শাখায় সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা। সেখানে মুখের ওপর তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয় না। এমনকি দ্বিতীয়বার নিশ্চিত হতে শাখাপ্রধানের কাছে গেলে, সেখান থেকেও আসে একই জবাব। অথচ, জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো কোনো অযৌক্তিক কারণে গ্রাহককে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে অনীহা দেখায়, গ্রাহকের সঙ্গে যথাযথ ব্যবহার করে না; এমন অভিযোগ বেশ পুরনো। সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের (ডিএমডি) কর্মকর্তাদের অন্তত ১০টি দল বিভিন্ন ব্যাংকে ঝটিকা পরিদর্শনে যায়। পরিচয় গোপন করে সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়ে তারা পান অভিযোগের সত্যতা। সঞ্চয়পত্র বিক্রির কাজে অন্তত ৪০টি ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় অসংগতি ও অপেশাদার আচরণ খুঁজে পান বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কর্মকর্তারা। যেখানে এসব ব্যাংকের শাখার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে সঞ্চয়পত্র বিক্রয়ে গ্রাহকসেবা দিতে অনীহা দেখিয়েছেন। দায়িত্বরত কিছু কর্মকর্তা সঞ্চয়পত্র সেবা কখনো দেননি বলেও জানান।
সরকারি সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে নির্ধারিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা এবং সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী সঞ্চয়পত্র বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকগুলো কোনো যোগ্য গ্রাহককে অযৌক্তিকভাবে সেবা দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে না। গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে টিআইএন নম্বর, ই-রিটার্নের প্রমাণ, কেওয়াইসি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করে নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করলে তা গ্রহণ ও সঞ্চয়পত্র ইস্যু করতে বাধ্য ব্যাংকগুলো। কোনো ব্যাংক এসব বিধান লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আগামীর সময়কে বললেন, ঢাকার চারটি ব্যাংকের শাখায় ঝটিকা সফর করেন তারা। এসময় ঘটনাক্রমে তার চোখের সামনে দুজন গ্রাহক সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংকে গেলেও ডেস্ক কর্মকর্তা তাদের একজনকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় না বলে ফেরত দেন। আরেকজন অন্য ব্যাংকের রেফারেন্স নিয়ে আসায় তাকে পাশের অন্য ব্যাংকের শাখায় চলে যেতে বলা হয়।
তিনি বললেন, ‘সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করলেও ব্যাংকের সব শাখা কাগজপত্র নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য, বিষয়টি অনেকে জানেন না, যা অবাক করার মতো।’
প্রিমিয়ার ব্যাংকের পুরান ঢাকার ধোলাইখাল শাখায় সঞ্চয়পত্র কিনতে গিয়েছিলেন দয়াগঞ্জ এলাকার নুরজাহান বেগম। সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় না বলে তাকে ব্যাংকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। পাশের মিডল্যান্ড ব্যাংকও তাকে ফিরিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালকের কাছে অবশ্য গোপন পরিদর্শনের বিষয়ে তথ্য নেই। প্রয়োজনীয় তথ্যের জন্য ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক ইস্তেকমাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি। ইস্তেকমাল হোসেন বললেন, ‘আমাদের ১০টি দল পরিচয় গোপন রেখে ৪০টি ব্যাংকের শাখায় সঞ্চয়পত্র বিক্রির বাস্তব চিত্র জানার চেষ্টা করে। সেখানে নানা অসংগতি ধরা পড়ে। অনেকে পেশাদার আচরণ করেননি। কোনো কোনো কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তাদের শাখায় কোনোদিন সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হয়নি। অথচ সব ব্যাংক সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে বাধ্য। তারা সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের আইডি ও পাসওয়ার্ড না পেলে নথিপত্র নিয়ে স্বীকারোক্তি দেবে এবং ফরমে সংশ্লিষ্ট শাখার নাম লিখে দেবেন।’
এ অভিযান চলবে জানিয়ে তিনি বললেন, ‘আর খেয়ালখুশিমতো গ্রাহককে ফেরত দেওয়া যাবে না। নিয়ম না মানলে অর্থ জরিমানা হবে।’
এর আগে গত ২৪ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগ থেকে দেশের সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের সঞ্চয়পত্র নিয়ে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ব্যাংকগুলোয় সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে না— এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে এসেছে।
সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তর বলছে, বর্তমানে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের চার ধরনের সঞ্চয়পত্র আছে। এগুলো হলো পরিবার সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছরমেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র ও তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র। মেয়াদ পূর্তিসাপেক্ষে সঞ্চয়পত্রে সুদের হার ১১ দশমিক ৭৭ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৮ শতাংশ। সঞ্চয় অধিদপ্তরের পাশাপাশি তফসিলি ব্যাংক থেকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়।




