মন্ত্রী যান নির্দেশ আসে দোকানে মূল্যতালিকা ওঠে না
- আইন আছে, তদারকিও আছে; তবু বাজারে উধাও মূল্যতালিকা
- কারওয়ান বাজারে কিছুটা নিয়ম, অন্য বাজারে শিথিলতা

সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর বাজারে মূল্যতালিকা টানিয়ে রাখার নির্দেশনা নতুন নয়। সরকার বদলেছে, মন্ত্রী বদলেছে, অসংখ্য অভিযান হয়েছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে এখনো দেখা যায় একই চিত্র— অধিকাংশ ক্রেতাই জানে না কোনো পণ্যের প্রকৃত দাম কত। ফলে বিক্রেতা যা বলছে, সেটিই মেনে নিতে হচ্ছে। চলতি মাসে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা টানিয়ে রাখার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু গত দুদিন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন দেখা যায়, কিছু দোকান মানলেও অধিকাংশ দোকান মানছে না এ নির্দেশনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যতালিকা শুধু একটি কাগজ নয়; এটি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তালিকা না থাকলে একই পণ্য ভিন্ন ভিন্ন ক্রেতার কাছে ভিন্ন দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়। এতে বাজারে স্বচ্ছতা কমে যায় এবং ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও কাঁঠালবাগান বাজার ঘুরে দেখা যায়, কারওয়ান বাজারের অধিকাংশ দোকানে মূল্যতালিকা টানানো থাকলেও কিছু দোকানে তা অনুপস্থিত। অন্যদিকে কাঁঠালবাগান বাজারে প্রায় দোকানেই মূল্যতালিকা চোখে পড়েনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারওয়ান বাজারে নিয়মিত ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা তদারকি করেন। ফলে সেখানে নিয়ম কিছুটা মানা হয়। কিন্তু অন্যান্য বাজারে সেই তদারকি তুলনামূলক কম হওয়ায় মূল্যতালিকা প্রদর্শনের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থাকে।
কাঁঠালবাগান বাজারে মুদি দোকানে কেনাকাটা করতে আসা রাশেদুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বললেন, ‘বাজার করার আগে বাসা থেকে তালিকা করে এনেছি। কিন্তু দোকানে যদি মূল্যতালিকা টানানো থাকত, তাহলে সহজেই বুঝতে পারতাম কোন পণ্যের দাম কত। এখন দোকানদার যে দাম বলছেন, সেটিই দিতে হচ্ছে।’
একই অভিজ্ঞতার কথা জানালেন কারওয়ান বাজার কিচেন মার্কেটে মুরগি কিনতে আসা আরেক ক্রেতা সিরাজ উদ্দিন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। হাতে বাজারের ব্যাগ। বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে দাম যাচাই করছেন। তিনি বলেছেন, ‘দোকানের সামনে বোর্ড আছে, কিন্তু সেখানে কোনো মূল্য লেখা নেই। তালিকা থাকলে আমার বাজেট অনুযায়ী পণ্য বেছে নিতে পারতাম। এখন প্রতিটি জিনিসের দাম আলাদা করে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে।’
কারওয়ান বাজারের মায়ের দোয়া জেনারেল স্টোরের মালিক হাফিজউদ্দিন বললেন, ‘যে ব্যবসায়ী মূল্যতালিকা রাখেন না, তিনি নিয়ম মানেন না। আমার দোকানে সবসময় তালিকা টানানো থাকে।’
তবে একই বাজারের চালের মার্কেটের বাহার ট্রেডার্সে গিয়ে মূল্যতালিকা পাওয়া যায়নি। দোকানের কর্মচারী জানিয়েছেন, তালিকা ছিল কিন্তু মালিক না থাকায় খুলে রাখা হয়েছে। পাশের একই মালিকের আরেক দোকানের কর্মী রকিবুল (ছদ্মনাম) বললেন, ‘তালিকা টানালে পণ্যের প্রদর্শনীতে সমস্যা হয়, তাই অনেক সময় খুলে রাখা হয়।’
ব্যবসায়ীদের এ যুক্তি মানতে নারাজ ভোক্তারা। তাদের মতে, মূল্যতালিকা এমন জায়গায় টানানো উচিত, যাতে ক্রেতা সহজেই দেখতে পারেন। তালিকা দোকানের ড্রয়ারে বা কাউন্টারের নিচে রাখার অর্থ কার্যত তালিকা না রাখারই সমান।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, দোকানে মূল্যতালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক। নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য জরিমানার বিধানও রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অভিযানের সময় ছাড়া অনেক বাজারে এই নিয়ম কার্যকর দেখা যায় না। বাজারে স্থিতিশীলতার সরকারি দাবি এবং বাস্তব চিত্রের মধ্যে এ ব্যবধানই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কারণ কোনো পণ্যের দাম স্থিতিশীল কি না, তা জানার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রকাশ্য মূল্যতালিকা। আর সেই তালিকাই যখন অধিকাংশ বাজারে অনুপস্থিত, তখন সাধারণ ক্রেতার পক্ষে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মূল্যতালিকা টানানো নির্দেশনা মানতে ব্যবসায়ীরা রাজি নন। মূল্যতালিকা টানানো না হলে ক্রেতারা ঠকে সহজে। সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যতালিকা টানানোর জন্য নানাভাবে ব্যবসায়ীদের আলাপ-আলোচনা, জরিমানাসহ নানা উদ্যোগ নিলেও সুফল আসেনি। যে লাউ সেই কদু। ব্যবসায়ীরা তাদের নিজস্ব গতিতে চলছেন।’




