অর্থবিভাগের মূল্যায়ন
রাজস্ব ঘাটতি বাড়াচ্ছে ঋণঝুঁকি
- দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর একটি কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে
- ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি হতে পারে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশের কাছাকাছি
- বাড়বে ঋণ-জিডিপি অনুপাত, কমবে বেসরকারি বিনিয়োগ

ছবি: এআই দিয়ে তৈরি
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি বাড়াচ্ছে ঋণের ঝুঁকি। এ কারণে দেশি ও বিদেশি ঋণের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে সরকারকে। পাশাপাশি উভয় ঋণের ওপর একটি কাঠামোগত নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে। সেই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের এই দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক দুর্বলতা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে অর্থায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং বাহ্যিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাতগুলো মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সক্ষমতাকে সংকুচিত করে ফেলছে বলে মনে করছে অর্থবিভাগ। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের জন্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে মধ্যমেয়াদি অর্থনৈতিক নীতি কাঠামো উপস্থাপন করেছেন, সেখানকার মূল্যায়নে এসব বিষয় উঠে এসেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ না হলে অনেকগুলো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। যেমন কোথায় কাটছাঁট করা হবে, অগ্রাধিকার কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সামাজিক খাতের বরাদ্দ কি সুরক্ষিত থাকবে এবং সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাত কি বঞ্চিত হবে। এ রকম নানা প্রশ্নের মধ্যে শেষ পর্যন্ত ভর্তুকিতে সমন্বয় করতে হবে সরকারকে। ফলে এর প্রভাব পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর। তাদের ওপর চাপ বাড়ে। আবার ঋণ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ কমাতে গিয়ে সেসব খাতের সুফলও পাওয়া যায় না।
অর্থবিভাগের নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ভিত্তি এবং অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ ছাড়াই উন্নয়ন ব্যয় অর্থায়নে সরকারের সক্ষমতার মূল উৎস। তবে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবেই বাজেট লক্ষ্যের তুলনায় ক্রমাগত ঘাটতি দেখা গেছে। সমকক্ষ দেশগুলোর তুলনায় এবং বাজেট লক্ষ্যমাত্রার সাপেক্ষে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় ক্রমাগতভাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হচ্ছে, যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা সম্পদের ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা তৈরি করেছে। গত পাঁচটি অর্থবছরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃত রাজস্ব আদায় বাজেট লক্ষ্যমাত্রা থেকে গড়ে ১৬ শতাংশ কম হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই ঘাটতির ব্যবধান আরও বেড়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ০৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৯ দশমিক ৪১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (মার্চ পর্যন্ত) মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ দশমিক ৩১৫ বিলিয়ন টাকা, যা নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৬ শতাংশ।
সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব: অর্থবিভাগ বলছে, ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব ঘাটতি থাকলে তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব সমন্বয়কে অপরিহার্য করে তুলবে। যেখানে পরিচালন ও মূলধন—উভয় ব্যয়ের ওপরই এই চাপ পড়বে। অভিঘাত পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় মধ্যমেয়াদজুড়ে ভিত্তি মাত্রার নিচে থাকবে। তবে রাজস্ব ভিত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান ক্রমশ কমে যাবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মূলধনী ব্যয়—যা সরকারি বিনিয়োগ এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের প্রধান চালিকাশক্তি—তা আরও বেশি কাটছাঁটের মুখে পড়বে। কারণ পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ কম থাকে। অভিঘাত পরিস্থিতিতে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে মূলধন ব্যয় মাত্র ৪ হাজার ৬২৫ বিলিয়ন টাকায় প্রক্ষেপিত হয়েছে, যা শুধু ২০২৮-২৯ অর্থবছরেই প্রায় ৯৬০ বিলিয়ন টাকার ঘাটতি নির্দেশ করে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) এই সংকোচন অবকাঠামো উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং সরকারের মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন কার্যক্রমের ওপর বিরূপ প্রভাব তৈরি করবে।
বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি: অর্থবিভাগ বলছে, রাজস্বের ঘাটতির ফলে আর্থিক ভারসাম্যের উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটে এবং পুঞ্জীভূত সরকারি ঋণ বৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। বাজেট লক্ষ্যমাত্রা থেকে ১৬ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতির পরিস্থিতিতে বাজেট ঘাটতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জিডিপির ৫ শতাংশের যে আর্থিক সীমা রয়েছে, সেটি অতিক্রম করার কাছাকাছি পৌঁছায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ ধরা হয়েছে। এটি ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৯১ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। যদিও অভিঘাত পরিস্থিতির মধ্যমেয়াদি প্রক্ষেপণের অধীনে পরবর্তী বছরগুলোতে এটি আর্থিক ভারসাম্য সীমার সামান্য নিচে অবস্থান করবে, তবুও এর গতিপথ উদ্বেগজনক এবং এই আর্থিক ভারসাম্য সীমার এত কাছাকাছি অবস্থান করার ফলে ভবিষ্যতের অন্য কোনো বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকবে না।
সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাতের ওপর প্রভাব: অর্থবিভাগ বলছে, অভিঘাত পরিস্থিতিতে ঋণ-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি পায়। ভিত্তি প্রক্ষেপণে জিডিপির প্রায় ৩৭-৩৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ঋণ অনুপাত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ধরা হয়েছে ৪০ দশমিক ০৮ শতাংশ। তবে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে ৪৪ দশমিক ১২ শতাংশে উন্নীত হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এই গতিপথ যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে তা বাংলাদেশের টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবনতিশীল অবস্থা নির্দেশ করে, যা পরবর্তী বছরগুলোতে সরকারের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা ও রাজস্ব পরিসরকে সংকুচিত করতে পারে।
বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর প্রভাব: অর্থবিভাগ বলছে, রাজস্ব ঘাটতির সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি হলো বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের ‘ক্রাউডিং আউট’ বা বিনিয়োগের সুযোগ সংকুচিত হওয়া। সরকারি রাজস্ব যখন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয়, তখন ব্যয়নির্বাহের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। অভ্যন্তরীণ আর্থিক বাজারে এর ফলে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদার সঙ্গে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে। ঋণ গ্রহণের ব্যয়ের ওপর এই ঊর্ধ্বমুখী চাপ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা এবং সামর্থ্য উভয়ই কমিয়ে দেয়। অভিঘাত পরিস্থিতি অনুযায়ী বেসরকারি বিনিয়োগ—যা বেইজলাইনের প্রক্ষেপণে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ৮ হাজার ৯৪ বিলিয়ন টাকা থেকে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে শক্তিশালীভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১১ হাজার ৫০৬ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছানোর প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল—তা এই ধাক্কার ফলে ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে কমে গিয়ে আনুমানিক ১০ হাজার ৬৪৯ বিলিয়ন টাকায় নেমে আসতে পারে। এটি বেইজলাইনের তুলনায় প্রায় ৮৫৭ বিলিয়ন টাকা কম। বেসরকারি বিনিয়োগের এই সংকোচন বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ বেসরকারি পুঁজি গঠনই হলো উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি সক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি, যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির কাঠামোর চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব: সরকারি উন্নয়ন ব্যয়ের সংকোচন, বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা এবং কঠোর অর্থায়ন পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাব মধ্যমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে কমাতে পারে। ভিত্তি প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২০২৭ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, ২০২৮ অর্থবছরে ৭ দশমিক ০ শতাংশ এবং ২০২৯ অর্থবছরের মধ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি পরিস্থিতিতে প্রবৃদ্ধির এই গতিপথ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে দৃশ্যমানভাবে নিচে নেমে আসবে, যা ২০২৭ অর্থবছরে আনুমানিক ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ, ২০২৮ অর্থবছরে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ২০২৯ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর অর্থ হলো, ১৬ শতাংশ রাজস্ব ঘাটতির কারণে মধ্যমেয়াদি কাঠামোর পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশকে প্রতি বছর আনুমানিক ১ দশমিক ০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হারাতে হতে পারে।




