শিল্পের সম্প্রসারণে নজর

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দেশের অর্থনীতি এখন এক সংকটময় পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ আছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সরকার। এজন্য নতুন করে কর আরোপ না করে ব্যবসার পরিবেশ সহজীকরণ এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতিকাঠামো প্রণয়নে গুরুত্ব দিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান গতিতে রাজস্ব আদায় হলে বছর শেষে সর্বোচ্চ ৪ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা আদায় হতে পারে। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি করতে হবে।
তবে এনবিআর এই বড় প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রাধান্য না দিয়ে বাজেটে রাজস্ব নীতিতে ব্যবসা সহজীকরণকে গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানি-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে প্রণোদনায় বিদ্যমান উৎস কর কর্তনের হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হচ্ছে। যদিও রপ্তানিকারকরা পুরোটা বাতিলের দাবি করে আসছিলেন।
এ ছাড়া প্রতি মাসের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার বিধান করা হচ্ছে। ফলে প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দেওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি ইআরপি সফটওয়্যারে কোনো ব্যবসায়ী যদি তার ক্রয়-বিক্রয়সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা রাখেন, তাহলে হার্ড কপি না রাখলেও সমস্যা হবে না।
এ বিষয়ে এনবিআরের এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘এবারের রাজস্ব নীতির মূল বিষয় হবে নতুন কর আরোপ নয়, কিছু খাতে অব্যাহতি এবং শুধু বাণিজ্য সহজীকরণ।’
এর বাইরে কিছু খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতি রয়েছে। এ খাতে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদে এই বছরের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা। এনবিআর এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করছে। মূলত দেশীয় প্রযুক্তি শিল্পকে
উৎসাহ দেওয়া, আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই কর সুবিধা অব্যাহত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভ্যাট অব্যাহতির কারণে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান স্থানীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ সংযোজন এবং উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। অন্যরাও এ খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উৎসাহিত হবে।
অন্যদিকে ব্লেন্ডার, জুসারসহ বিভিন্ন ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্স তৈরির যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রিডিউসড করহার এবং আমদানি শুল্ক সুবিধা চলতি বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া এলপি গ্যাস আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ককর অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এলপিজি খাতে কর কাঠামো পুনর্গঠন করে আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় উৎপাদন, ব্যবসায়ী পর্যায় ও আগাম কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, যা খাতটিতে বড় ধরনের কর সুবিধা হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা।
রাজধানীর অন্যতম জনপ্রিয় গণপরিবহন মেট্রোরেল ভাড়ার ওপর বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি আরও দুই বছর বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০২৮ সালের জুন মাসের আগে মেট্রোরেল ব্যবহারকারীদের ভাড়া বৃদ্ধির অতিরিক্ত চাপ বহন করতে হবে না।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দেশের অর্থনীতি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের
চ্যালেঞ্জ আছে। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘এই কারণ বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু বাজেটে উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ নয়; বরং স্থিতিশীল অর্থনীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতিগত কাঠামো নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’— যোগ করেন তিনি।




