রাজস্ব আদায়
ঘাটতি ৯৩ হাজার কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হলেও বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থবছরের শুরু থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং আমদানি কমে যাওয়ার প্রভাব রাজস্ব আহরণে পড়েছে। এসব কারণে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত হারে রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব হয়নি।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত থেকে সবচেয়ে বেশি ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগ ব্যয় কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়িক লেনদেন প্রত্যাশিত মাত্রায় না বাড়ায় ভ্যাট আদায়ে প্রত্যাশিত গতি আসেনি। মানুষের ব্যয় সংকোচনের প্রবণতাও এ খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
অন্যদিকে আয়কর খাতে তুলনামূলক ভালো প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এ খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা আরও কিছুটা বাড়তে পারে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, চলতি অর্থবছরে বকেয়া কর আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মাঠপর্যায়ের কর কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল এবং বকেয়া আদায়ে প্রয়োজন হলে ব্যাংক হিসাব জব্দসহ বিভিন্ন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে আয়কর আদায়ে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে।
অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন
ড. জাহিদ হোসেন, অর্থনীতিবিদ
এদিকে শুল্ক খাত থেকে আদায় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি কমে যাওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় কয়েকটি পণ্যে কর ছাড় দেওয়ার কারণে এ খাতে প্রত্যাশিত রাজস্ব আসেনি।
রাজস্ব কর্মকর্তারা মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি কমেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ভোগ ব্যয়ও হ্রাস পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভ্যাট ও শুল্ক আদায়ে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতি শুধু রাজস্ব প্রশাসনের দুর্বলতার কারণে নয়, এটি অর্থনীতির সামগ্রিক ধীরগতিরও প্রতিফলন। যখন বিনিয়োগ, আমদানি, উৎপাদন ও ভোগ কমে যায়, তখন রাজস্ব আদায়ও স্বাভাবিকভাবেই কমে।’
জাহিদ হোসেন আরও বলেছেন, শুধু কর আদায়ে কঠোরতা বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বাড়ানো সম্ভব নয়। করের আওতা সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়নের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ টেকসইভাবে বাড়াতে হবে। অন্যথায় আগামী অর্থবছরগুলোয়ও উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সরকার প্রতি বছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সেই লক্ষ্যের সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় বড় রাজস্ব ঘাটতি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হবে এবং বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বাড়তে পারে— যোগ করেন তিনি।




