বাংলাদেশের সংকটের সারে মিয়ানমারের বিস্ফোরক!
- মিয়ানমারে বিস্ফোরক তৈরিতে ইউরিয়া ব্যবহারের শঙ্কা
- জনশূন্য রাখাইনে চাষাবাদও বন্ধ প্রায় সারের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন
- দাহ্য পদার্থের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় হয় বোমার উপকরণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কক্সবাজারের রামুর কৃষক আব্দুল কাদের। এক একর জমিতে করেছেন আমনের চাষ। ১০০ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন তার। চারা রোপণের এক মাস পার হলেও পেয়েছেন মাত্র ৫০ কেজি। বাকি সারের আশায় ঘুরছেন ডিলারের দোকানে।
গত জুলাইয়ের বন্যায় বীজতলা নষ্ট হয় খুনিয়াপালং ইউনিয়নের আব্দুল কাদেরের। এক মাস পিছিয়ে শুরু হয় ধান আবাদ। ডিলারের দোকানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মিলছে সর্বোচ্চ ২০ কেজি সার। অথচ ধানক্ষেতের পাশ দিয়েই মহাসড়ক ধরে সেই সার পাচার হচ্ছে পাশের দেশ মিয়ানমারে। গত ৫ সেপ্টেম্বরও কয়েক কিলোমিটার দূরের মরিচ্যা চেকপোস্টে ধরা পড়ে ১৫ টনের এমনই একটি চালান। কৃষির জন্য বরাদ্দ সার যেখানে কৃষকের কাছেই দুর্লভ, সেখানে পাচারের সময় ধরা পড়ছে বড় বড় চালান।
সীমান্ত লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলছে রক্তক্ষয়ী সংঘাত। লড়াই চলছে আরাকান আর্মি ও জান্তা বাহিনীর। সক্রিয় রয়েছে চারটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠনও। রাজ্যটির অনেক এলাকা এখন জনশূন্য, চাষাবাদও বন্ধ প্রায়। তাহলে প্রশ্ন— এত সার কেন যাচ্ছে সেখানে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের শঙ্কা, পাচার হওয়া এই ইউরিয়া সারের বড় একটি অংশ ব্যবহার করা হচ্ছে বিস্ফোরক তৈরিতে।
কিছু দাহ্য পদার্থের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ায় এটি রূপ নেয় বোমা তৈরির উপকরণে। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া সার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রাথমিক তথ্য মেলার কথা জানালেন বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞ ও কক্সবাজারের উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার।
সীমান্তে অন্তত ২০টি পাচারকারী চক্র সক্রিয় থাকার তথ্য মিলেছে আগামীর সময়ের অনুসন্ধানে। আর এসব চক্রে যুক্ত আছে কয়েকশ রোহিঙ্গা শ্রমিক। কক্সবাজারের রামু, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে চলছে এই কারবার। স্থলপথের পাশাপাশি নাফ নদীসহ সাগরপথেও চলছে পাচার।
লাভের অঙ্কই বাড়িয়ে দিচ্ছে এই পাচার। মিয়ানমারে এক বস্তা সারের দাম প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা। অথচ বাংলাদেশে সরকারি দাম মাত্র ১ হাজার ৩৫০ টাকা। বস্তাপ্রতি প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা লাভের আশায় এই পথ বেছে নিয়েছে পাচারকারীরা। যে সারে কেজিপ্রতি ২১-৫০ টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি দিচ্ছে বাংলাদেশের সরকার।
২০১৭ সালের পর ১০ থেকে ১৩ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ায় রাখাইনের জনমিতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। ওই বছর পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মো. মোস্তফা বলছিলেন, রাখাইনের বড় একটি অংশ এখন জনশূন্য। অনেক এলাকায় চাষাবাদ করার মতো মানুষও নেই। রাখাইনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চলছে জান্তা বাহিনীর পাল্টা আক্রমণ। রোহিঙ্গাদের চারটি সশস্ত্র সংগঠনও সক্রিয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইউরিয়া কৃষিকাজের বাইরে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার হচ্ছে কি-না, তা এক বড় প্রশ্ন।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কর্নেল হাসিনুর রহমানের মতে, সংঘাতপূর্ণ রাখাইনে ইউরিয়া সারের ভিন্ন ব্যবহার হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তার ভাষ্য, ইউরিয়া সার বিস্ফোরক তৈরির মৌলিক উপাদান হিসেবে ব্যবহারের শঙ্কা রয়েছে। এমন শঙ্কার রয়েছে গ্রহণযোগ্য কারণও। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. কামরুল হোসাইন জানালেন, বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ইউরিয়াসহ সহজলভ্য উপাদানের অপব্যবহারের নজির রয়েছে। কারণ, নির্দিষ্ট রাসায়নিকের সঙ্গে মিশিয়ে এটি ব্যবহার করা সম্ভব বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ হিসেবে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার নিশ্চিত করেছেন, কিছু দাহ্য পদার্থের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ইউরিয়া সার বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। বোমা নিষ্ক্রিয়করণে চারবার প্রশিক্ষণ পাওয়া এ পুলিশ পরিদর্শক বলছেন, উখিয়া হয়ে পাচার হওয়া সার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রাথমিক তথ্যও পাওয়া গেছে।
কক্সবাজার অঞ্চলে দায়িত্বে থাকা একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বললেন, ‘বর্ষায় ভূপ্রকৃতির কারণে রাখাইনে সম্মুখযুদ্ধ কঠিন হয়ে পড়ে। শরতের শেষে বৃষ্টি কমলে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বিস্ফোরক তৈরিতে সার ব্যবহারের বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।’
বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ, কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে গত তিন মাসে জব্দ হয়েছে হাজার হাজার কেজি সার। গ্রেপ্তার হয়েছে বহু পাচারকারী। যদিও স্থানীয়দের অভিযোগ, ধরা পড়ছে শুধু ছোট চালান। মূল চক্র থাকছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এমনকি পাচারে সরকার অনুমোদিত ডিলারদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও দৃশ্যত দেখা যায়নি কঠোর কোনো পদক্ষেপ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত জুনে কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালীর ভাদিতলী, গয়ালমারা ও পশ্চিম পালংখালীতে আলাদা অভিযানে উদ্ধার করা হয় ৭৪ বস্তা সার। ২২ জুন পালংখালীতে যৌথ অভিযানে আরও ৩০ বস্তা এবং ২৮ ও ২৯ জুন টেকনাফে নাফ নদীপথে পাচারের উদ্দেশ্যে মজুদ ৩২ বস্তা সার ও দুটি কাঠের নৌকা জব্দ করে বিজিবি। ৩০ জুন মরিচ্যা যৌথ চেকপোস্টে জব্দ হয় ১০০ বস্তায় পাঁচ টন। এ ধারা অব্যাহত ছিল জুলাইয়েও।
এরপর ৫ সেপ্টেম্বর একই চেকপোস্টে ১৫ টনের চালান আটকের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার সরবরাহ ব্যবস্থার কোন স্তর পেরিয়ে সীমান্তে পৌঁছাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সীমান্তে অভিযান চালিয়ে এই পাচার থামানো যাবে না। সার বরাদ্দ থেকে ডিলার ও পরিবহন— পুরো সরবরাহ ব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। নতুবা কৃষকের হাসিমুখ কেড়ে নেবে এই চোরাচালান।
রামু-উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে সার পাচারে অন্তত ২০টি চক্র সক্রিয়। রামুর গর্জনিয়া থেকে উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়া হয়ে টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে পাচারের পয়েন্ট। স্থলপথের পাশাপাশি সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া ও হাতিয়া থেকে মাছধরা নৌকায় করেও মিয়ানমারে পাঠানো হচ্ছে সার।
রামুর সার ব্যবসায়ী আব্দুল মাজেদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে ভর্তুকির সার সংগ্রহ করে সীমান্তে মজুদ করা হয়। পরে রাতের আঁধারে পাহাড়িপথ ও নাফ নদী দিয়ে তা মিয়ানমারে পাঠানোর চেষ্টা চলে।
জানা গেছে, দামের বড় ব্যবধান পাচারকে করে তুলেছে লাভজনক। সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, মিয়ানমারে ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার দাম প্রায় আড়াই লাখ কিয়াত। এক টাকা ৩২ কিয়াত হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর মূল্য প্রায় ৭ হাজার ৮১২ টাকা। বাংলাদেশে কৃষক পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ বস্তাপ্রতি প্রায় ৬ হাজার ৪৬২ টাকা বেশি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
রাসায়নিক সার ও অন্যান্য শিল্প পণ্য উৎপাদন এবং বিতরণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ রাসায়নিক শিল্প করপোরেশনের (বিসিআইসি) চট্টগ্রাম কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাঈনুদ্দিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সরকার ইন্দোনেশিয়া, তিউনিশিয়া ও মরক্কো থেকে সার আমদানি করে। পাশাপাশি কাপকোর উৎপাদিত সারও কিনে সরকারি ডিলারদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়। অসাধু ব্যক্তিরা অতিরিক্ত মুনাফার আশায় এসব সার মিয়ানমারে পাচার করছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক তপন কুমার রায় জানালেন, কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়ার নির্ধারিত দাম কেজিপ্রতি ২৭ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারদর ও পরিবহন ব্যয় বিবেচনায় প্রকৃত মূল্য ৫০-৭৫ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ফলে কেজিপ্রতি প্রায় ২১-৫০ টাকা ভর্তুকি বহন করে সরকার। ৫০ কেজির এক বস্তায় ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন জানালেন, ১ জুন থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চোরাচালানবিরোধী অভিযানে ৪ হাজার ৮৪ বস্তা সার জব্দ এবং ১৩০ জনকে আটকের তথ্য।
আর ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলছিলেন, জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত উখিয়া সীমান্তে ১৯ হাজার ৭৫০ কেজি সার জব্দ করেছে বিজিবি।
যদিও কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর হাতে ধরা পড়ছে বিচ্ছিন্ন চালান, পাচারের সারের মূল অংশ পৌঁছে যাচ্ছে মিয়ানমারে। এর পেছনে রয়েছে বহুস্তরবিশিষ্ট সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট।
কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, শুধু সীমান্তে চালান আটক করে পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়। সার বরাদ্দ থেকে ডিলার, পরিবহন, মজুদ, বিক্রিসহ সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় ফাঁক তৈরি হচ্ছে, সেটি খুঁজে বের করা জরুরি।
কক্সবাজার জেলায় সরকারি সার ডিলার রয়েছেন ১৬৪ জন। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে মিয়ানমারে সার পাচারের অভিযোগ পুরনো হলেও এখনো কোনো ডিলারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’র সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন।
এই অভিযোগের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে উল্লেখ করে দায় সারলেন জেলা কৃষি বিভাগের উপপরিচালক বিমল কুমার প্রামাণিক। জানতে চাইলে উখিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কামনাশীষ সরকার বললেন, বরাদ্দের বাইরে কীভাবে সার সীমান্তে পৌঁছেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
আর রামুর কৃষি কর্মকর্তা সুশান্ত দেবনাথের ভাষ্য, অবৈধ পরিবহন ও পাচার রোধে অভিযান চলবে।
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বললেন, ‘সিন্ডিকেট শনাক্তে বিজিবি, কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা সার মনিটরিং কমিটির সভায়ও বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে সভায় সীমান্ত দিয়ে সার পাচার প্রতিরোধে সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়।’



