আগামীর সময়

খুলনা

ঈদের ছুটিতে বেপরোয়া সন্ত্রাসীরা

  • সন্ত্রাসীদের গুলিতে একই পরিবারের চারজন আহত
  • পুলিশের চেকপোস্টে ফাঁকা গুলি
  • শিশু ও কলেজছাত্রীর লাশ উদ্ধার
ঈদের ছুটিতে বেপরোয়া সন্ত্রাসীরা

সংগৃহীত ছবি

খুলনায় ঈদের ছুটির মধ্যে বেপরোয়া ছিল সন্ত্রাসীরা। বন্ধের পাঁচদিনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে একই পরিবারের চারজন আহত হয়েছে। এছাড়া মহানগরীর মহেশ্বরপাশায় পুলিশের চেকপোস্টে ফাঁকা গুলির ঘটনা এবং সাড়ে ৪ বছরের শিশু ও কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষকে আতঙ্কের মধ্যেই ঈদ কাটাতে হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিখোঁজের ১২ ঘণ্টা পর গত সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে নগরীর হরিণটানা গেট সংলগ্ন একটি ফাঁকা স্থান থেকে সাড়ে চার বছর বয়সী জান্নাতুল মাওয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটি নগরীর লবণচরা থানার রায়পাড়া কালভার্ট এলাকার বাসিন্দা শাহাজালালের মেয়ে।

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তুহিনুজ্জামান জানাচ্ছিলেন, ‘সোমবার দুপুরে বাবা-মায়ের সঙ্গে ছোট মামার বিয়ের দাওয়াত খেতে নগরীর সাচিবুনিয়া মোহাম্মাদপুর এলাকায় যায় জান্নাতুল মাওয়া। সেখানে পরিচিত এক দাদা তাকে আইসক্রিম খাওয়ানোর কথা বলে ডেকে নিয়ে যায়। মেয়ের ফিরে আসতে দেরি দেখে মা ফোন দেয়। সে সময় তাকে জানানো হয় শিশুটি আইসক্রিম খাচ্ছে। ওর যেতে একটু দেরি হবে। এরপর থেকে পরিচিত ওই দাদার ফোন বন্ধ হয়ে যায়।’

‘দুপুরের পর মাওয়াকে ফিরে পেতে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নিতে থাকে। না পেয়ে বাবা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। রাত ২টার দিকে পুলিশ ও পরিবারের সদস্যরা শিশুটিকে হরিণটানা গেট সংলগ্ন একটি ফাঁকা স্থান থেকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। মরদেহের পাশে একটি দড়ি ছিল’, যোগ করেন ওসি।

একই দিন রাতে কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের জোড়শিং গ্রামে স্বামীকে শ্বাসরোধ হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। ঘটনার পর থেকে লাপাত্তা স্ত্রী খুকুমনি। নিহত ফজলু গাজী জোড়শিং গ্রামের মৃত ফকির গাজীর ছেলে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, সোমবার সন্ধ্যার পর জোড়শিং গ্রামের ফজলু গাজীর (৬৬) সঙ্গে দ্বিতীয় স্ত্রী খুকুমনির কথা কাটাকাটি হয়। রাত ৮টার দিকে খুকুমনি স্বামীকে শ্বাসরোধ ও অণ্ডকোষ চেপে হত্যা করে পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা গ্রাম্য চিকিৎসক নিয়ে আসলে তিনি মৃত ঘোষণা করেন।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর পার্শ্ববর্তী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্ত খুকুমনিকে বিয়ে করেছিলেন ফজলু গাজী। খুকুমনি পাশের আংটিহারা গ্রামের মৃত শামসুর গাজীর মেয়ে। কয়রা থানার ওসি (তদন্ত) মো. শাহ আলম বলছিলেন, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

অপরদিকে চাঁদাবাজি মামলায় চয়ন ব্যাপারি নামে এক চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত সোমবার দুপুর ২টার দিকে তাকে রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার চয়ন খুলনা সদর থানার গোলাম মোস্তফার ছেলে। তার বিরুদ্ধে খুলনার বিভিন্ন থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে।

র‌্যাব-৬ জানিয়েছে, খুলনা সদর থানায় দায়ের হওয়া চাঁদাবাজি মামলার অন্যতম আসামি পূর্ব রূপসা বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান করছে— এমন সংবাদের ভিত্তিতে একটি চৌকষ অভিযানিক দল অভিযান চালিয়ে চয়ন ব্যাপারিকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে মারপিট, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তার গ্রেপ্তারের সংবাদে এলাকার মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পরে তাকে খুলনা সদর থানায় হস্তান্তর করা হয়।

এদিকে, গত মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে সদর থানার একটি বাড়ি থেকে কুলসুম আক্তার সাথী (২৮) নামে এক শিক্ষার্থীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি নগরীর লবণচরা থানার টেক্সটাইল কলেজের ছাত্রী ছিলেন। মৃত সাথী বাগেরহাট জেলার মোরেলগঞ্জ উপজেলার গোয়াবাড়ি গ্রামের কামরুল ইসলাম তালুকদারের মেয়ে।

স্থানীয়রা জানায়, জাহিদুর রহমান সড়কের শামীমা নাসরিনের বাড়ির দ্বিতীয় তলার মেসে বসবাস করতেন সাথী। পড়াশোনার পাশাপশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির লোকজনের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা একটি কক্ষের দরজা ভেঙে সাথীকে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করে।

খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কবির হোসেন মন্তব্য করেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে সাথী আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সঠিকভাবে বলা যাবে।

অপরদিকে, পরকিয়ার জের ধরে ঘরের ভেতর ঢুকে গুলি করে একই পরিবারের ৪ জনকে আহত করেছে দুর্বৃত্তরা। গত বৃহস্পতিবার সকাল লবণচরা থানার কৃষ্ণনগর ঠিকরাবাদ এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে দুইজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

আহতরা হলেন, কাজী আনিসুর রহমান, তার স্ত্রী রঞ্জুয়ারা বেগম, ছেলে রাইছুল ইসলাম ও তার ছোট ছেলে রাশিদুলের স্ত্রী ফাহিমা। এদের মধ্যে রঞ্জুয়ারা বেগম ও ফাহিমাকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

স্থানীয়রা জানান, কাজী আনিসুরের ছোট ছেলে রাশিদুল মাদকের একটি মামলায় তিন বছর আগে জেলে যায়। সেখানে ইমরান নামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয়। সে সুবাদে রাশিদুল তার বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। এই সুযোগে ইমরানের স্ত্রী ফাহিমার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এছাড়া ৬ মাস আগে ইমরান পুনরায় একটি মামলায় কারাগারে গেলে রাশিদুল ফাহিমাকে বিয়ে করে। এ ঘটনা জানতে পেরে ইমরান ক্ষুব্ধ হয় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ইমরান উক্ত ঘটনা ঘটায়।

লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তুহিনুজ্জামান বলছিলেন, পরকীয়ার জের ধরে এ গুলির ঘটনা ঘটেছে। কাজী আনিসের স্ত্রী এবং পুত্রবধূ ফাহিমার পায়ের গুলি বের করতে না পারায় তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। হামলায় অংশ নেওয়া ৬ জনকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে।

এছাড়া দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা ফাঁড়ির সামনে পুলিশের চেক পোস্ট লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। এ ঘটনায় গত ১৭ মার্চ রাতে গুলির ঘটনায় হাসিবুল আলম সজল নামে এক সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত বুধবার রাতে নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল কলেজের সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সজল খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ মোড়ের মৃত এহসানুল আলমের ছেলে।

হরিণটানা থানার ওসি (তদন্ত) টিপু সুলতান ও দৌলতপুর থানার ওসি জানিয়েছেন, চেক পোস্ট লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ছোড়ার ঘটনায় দৌলতপুর থানায় মামলা করে পুলিশ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে হাসিবুল আলম সজলকে গ্রেপ্তার করে হরিণটানা থানা পুলিশ। পরে তাকে দৌলতপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। হাসিবুল আলম সজলের বিরুদ্ধে হত্যাসহ দুটি মামলা আছে।

    শেয়ার করুন: