কাল রাজশাহী আসছেন তারেক রহমান
পদ্মা ব্যারাজ থেকে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রধানমন্ত্রীর কাছে নগরবাসীর যত প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে প্রস্তুত করা হয়েছে মঞ্চ। ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহীর উন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ থেকে শুরু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও শিল্পায়নের প্রত্যাশা নগরবাসীর। কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে নতুন বিনিয়োগ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও রপ্তানির সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনীতিতে গতি আনার দাবিও দীর্ঘদিনের। সেই প্রত্যাশার মধ্যে আগামীকাল মঙ্গলবার প্রথমবারের মতো রাজশাহী সফরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বিকাল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় বক্তব্য দেবেন তিনি। তাকে বরণ করতে প্রস্তুত নগরী। জনসভাস্থলের আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন।
রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশা, এই সফর শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ও শিল্পায়নের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলবে।
রাজশাহীর তরুণদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা কর্মসংস্থান। এর পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
আব্দুল্লাহিক কাফী নামের এক যুবক বলেছেন, রাজশাহীতে কর্মসংস্থানের অভাব তরুণদের জন্য বড় সমস্যা। তার প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখানে একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেবেন। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
আব্দুল্লাহ আল মামুন ওয়াসিফের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রী রাজশাহীর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেবেন। শিক্ষানগরী হিসেবে রাজশাহীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি নগরীকে আধুনিক, শান্তিপূর্ণ ও বসবাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেবেন।
শিক্ষার্থী খালিদ বিন ওয়ালিদ আবির বলেছেন, রাজশাহীবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির জানিয়েছেন, গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি সাদাপোশাকে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। থাকবে স্ট্যাটিক ও স্ট্রাইকিং ফোর্স। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সেক্টরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
তিনি আরও জানালেন, বিমানবন্দর থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত সড়কে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেসব সড়ক দিয়ে চলাচল করবেন এবং যেসব স্থানে অবস্থান করবেন, সেসব জায়গায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তার পাশাপাশি যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন ও পরিচ্ছন্নতার কাজও করা হয়েছে। সড়কের বিভাজকে নতুন রং, পুরোনো স্থাপনায় রঙের প্রলেপ এবং বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজের মাধ্যমে নগরীকে সাজানো হয়েছে। ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে তৈরি করা হয়েছে ৫৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩৫ ফুট প্রস্থের মঞ্চ। মাঠ ও আশপাশে স্থাপন করা হয়েছে শতাধিক মাইক এবং চারটি এলইডি স্ক্রিন। আয়োজকদের বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে মঞ্চ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার বাইরে মাঠে কোনো ব্যানার, ফেস্টুন বা বিলবোর্ড রাখা হয়নি।
আজ সোমবার দুপুরে জনসভাস্থল পরিদর্শন করেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী-৩ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন, রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী, জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম, আরএমপি কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির এবং রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ সুইট।
পরিদর্শন শেষে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে। রাজশাহীর সঙ্গে তারেক রহমানের আবেগের সম্পর্ক রয়েছে। এই মাঠেই তিনি নির্বাচনী প্রচারের শেষ বক্তব্য দিয়েছিলেন। এবার সরকারপ্রধান হিসেবে তার আগমনকে ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশাও অনেক।
রাজশাহীর উন্নয়ন প্রসঙ্গে রিটন জানিয়েছেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ, বন্ধ রেশম কারখানা চালু এবং হাইটেক পার্ক নতুনভাবে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এসব উদ্যোগের অগ্রগতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য আরও কিছু পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তিনি রাজশাহীতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, আম সংরক্ষণের জন্য আধুনিক হিমাগার নির্মাণ এবং পদ্মার পাড়ে নতুন স্মৃতিসৌধ বা স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ রাজশাহী মহানগর ও আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
নগরীর পরিচ্ছন্নতা, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা ও নাগরিক সেবার মান উন্নত করার কাজ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন রিটন। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে রাজশাহীকে আরও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য আছে তাদের।
রাজশাহীর কৃষি ও শিল্পের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু। তিনি জানালেন, রাজশাহীর অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি কৃষি। তাই কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, আখচাষিদের সহায়তা এবং কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আখচাষিদের প্রণোদনা দেওয়ার কর্মসূচিও।
মিনু মনে করেন, রাজশাহী বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চালু এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা গেলে কৃষিপণ্য রপ্তানির সুযোগ বাড়বে। এতে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে। পাশাপাশি রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশু হাসপাতাল চালু, ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে বিরতিহীন ট্রেন চালু, কলকাতার সঙ্গে রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং চার লেনের বাইপাস সড়ক নির্মাণ এ অঞ্চলের চিকিৎসা, যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে।
রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া চিনি ও রেশমশিল্পের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন ভূমিমন্ত্রী। তার মতে, নতুন বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য সরকার, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আরেকটি উদ্দেশ্য সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া। মিনু জানিয়েছেন, দেশের স্বার্থ সবার আগে। দল ও জনগণের কল্যাণকে গুরুত্ব দিয়ে রাজশাহীর উন্নয়ন এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন বলে তিনি আশাবাদী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে সামরিক বিমানে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যাবেন তারেক রহমান। সেখান থেকে রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন শেষে রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা আছে তার। দুপুর দেড়টায় রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী ধর্মসভা মন্দির পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর রাজশাহী সার্কিট হাউসে কিছুক্ষণ অবস্থান করে বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় যোগ দেবেন তিনি।
রাজশাহীর কর্মসূচি শেষে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে রহমতগঞ্জের জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে রাতে ঢাকায় ফেরার কথা আছে তার। এক দিনের সফরে তিন বিভাগের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি।





