সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত ঢাকায়, গ্রামে গলিত মরদেহ মুক্তিযোদ্ধা বাবার
- ছেলে কর্মরত বাংলাদেশ বেতারে, অন্য ছেলে ব্যাংক কর্মকর্তা, মেয়ে খাদ্য বিভাগে

রাজধানী ঢাকার মিরপুরে যুগ্ম সচিব ও বুয়েটশিক্ষক সন্তানের বৃদ্ধ মায়ের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের রেশ কাটতে না কাটতেই, মিরপুরে ঘটেছিল ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর নিঃসঙ্গ মৃত্যুর ঘটনা। ঘরের দরজা ভেঙে উদ্ধার করা হয়েছিল তাদের বিকৃত মরদেহ।
নগরজীবনের সেই নিষ্ঠুরতার প্রতিচ্ছবি যেন এবার দেখা গেল দূর মফস্বলেও। সন্তানরা সবাই ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত, কর্মরত সরকারি-বেসরকারি বড় বড় পদে; অন্যদিকে জন্মদাতা বাবার পচাগলা মরদেহ পড়ে ছিল গ্রামে নিজ ঘরের চেয়ারে। মৃত্যুর পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও খবর রাখার ছিল না কেউ। এমন ঘটনাই ঘটেছে পটুয়াখালীর বাউফলে।
বাউফল উপজেলার বগাবাজার এলাকার নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের পচাগলা মরদেহ। গত রবিবার তার বাসা থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে থাকলে সন্দেহ হয় প্রতিবেশীদের। কয়েক দিন ধরে সিরাজুল ইসলামের কোনো খোঁজ না পেয়ে একপর্যায়ে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ঢোকেন ঘরের ভেতরে। সেখানে তাকে দেখতে পাওয়া যায় একটি চেয়ারে বসা মৃত অবস্থায়।
ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ উদ্ধারের অন্তত দুদিন আগে মৃত্যু হয়েছিল তার। চেয়ারে বসা মরদেহের পায়ের নিচে পড়ে ছিল প্রচুর রক্ত। পরে এলাকার লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তা উদ্ধার করে।
প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলামের সন্তানরা সবাই সমাজে প্রতিষ্ঠিত, কর্মরত সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদে। ছেলে সোহাগ কর্মরত বাংলাদেশ বেতারে। অন্য ছেলে শহিদুল একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা। আর মেয়ে ইসরাত জাহান ঢাকায় খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বরত।
সন্তানদের কর্মব্যস্ততা ও ঢাকার জীবনের কারণে সিরাজুল ইসলামের স্ত্রী নুরজাহান বেগমও সন্তানদের সঙ্গে থাকতেন ঢাকাতেই। বৃদ্ধ সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের বাড়িতে একাই বাস করছিলেন। মাঝেমধ্যে ঢাকায় সন্তানদের কাছে যেতেন, তবে বেশিরভাগ সময় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে একাকীই কাটাতে হতো। তার এই নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত মৃত্যু এলাকায় চাঞ্চল্য ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
প্রতিবেশী নওশাদ শাহরিয়ার দুলাল আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা কয়েক দিন আগে ঢাকা থেকে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। পরে তার বোন বাড়িতে এসে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া পাননি। বিষয়টি জানাজানি হলে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতিতে ঘরের দরজা ভেঙে ঢোকা হয়। এ সময় তাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় মৃত পাওয়া যায়।’
বাবার এমন নিঃসঙ্গ মৃত্যুতে তৈরি হওয়া সমালোচনা প্রসঙ্গে ছেলে শহিদুল ইসলাম গাইলেন সাফাই। তিনি বললেন, ‘আমি চাই না আমার বাবাকে নিয়ে কোনো নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ হোক। বাবা শুধু বাউফলেই থাকতেন না, ঢাকা ও বাউফল দুই জায়গাতেই তিনি সময় কাটাতেন। আমরা সবাই চাকরিসূত্রে ঢাকায় অবস্থান করি। সম্প্রতি তিনি ঢাকায় চিকিৎসার পর বাড়িতে এসেছিলেন। সেখানেই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে।’
বাউফল থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন বলে তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন। তার পায়ে একটি ইনফেকশন ছিল। পুলিশি আনুষ্ঠানিকতা শেষে রবিবার রাতেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে দাফন করা হয়।




