একই গ্রামে প্রতি বছর শিয়ালের থাবা, একটুর জন্য বাঁচল জোনাকি

দাদীর কোলে মাথা রেখে নিঃশব্দে শুয়ে আছে ছোট্ট জোনাকি আক্তার। চার বছরের এই শিশুটির গাল ও কান হিংস্র শিয়ালের কামড়ে ক্ষতবিক্ষত। দাদীর কাঁপা হাতে জড়িয়ে থাকা নাতনির শরীর যেন এক জীবন্ত আতঙ্কের ছবি, যা নাড়া দিয়েছে পুরো গ্রামকে।
জানা যায়, শনিবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যায় কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নের উত্তর রাজকুন্তী পুঁথিপাড়া গ্রামে ঘটে এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। বাড়ির উঠানে প্রাকৃতিক ডাকে বাইরে গেলে ওঁত পেতে থাকা একটি শিয়াল আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে জোনাকির ওপর। মুহূর্তেই গাল ও কানে কামড় বসায়। চিৎকার শুনে গরুর গোয়ালঘর থেকে দৌড়ে এসে মা শিশুটিকে উদ্ধার করেন। রক্তাক্ত মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরার পরই স্পষ্ট হয় ভয়াবহতার চিহ্ন।
এখানেই শেষ নয়, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে আরও ভয়াবহ স্মৃতি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে ঠিক একই গ্রামে শিয়ালের হামলায় প্রাণ হারায় দুই বছরের শিশু হুমায়রা। মায়ের কোলে খেলতে খেলতেই পাশের ঘরে যায় সে। কিছুক্ষণ পর একা ফিরে আসার পথে অন্ধকারে ওঁত পেতে থাকা শিয়াল তাকে গলায় কামড়ে টেনে নিয়ে যায়। পরিবারের খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে বাড়ির পেছনের ঝোপে পাওয়া যায় তার ক্ষতবিক্ষত নিথর দেহ। সেই দৃশ্য আজও ভুলতে পারেননি গ্রামবাসী।
এর আগে ২০২৪ সালের রমজান মাসে ইফতারের পর আরাফ নামের আরেক শিশু উঠানে খেলা করার সময় উঠান থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শিয়াল। তার মরদেহও পরে জঙ্গলে উদ্ধার করা হয়।
গতকালের ঘটনায় জোনাকির মা বলছেন , শনিবার (৪ এপ্রিল) সন্ধ্যার সময় গরুর গোয়াল ঘরে মশারি টানানোর জন্য যাই। এসময় জোনাকি ঘর থেকে বের হয়ে টিউবওয়েলের কাছে টয়লেট করার জন্য যায়। পরক্ষণই আমি মেয়ের চিৎকার শোনে গোয়াল ঘর থেকে বের হয়ে দেখি একটি শিয়াল দৌড়ে যাচ্ছে। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই কান ও গালে শিয়ালের কামড়ের ক্ষত-বিক্ষত দাগ দেখতে পাই। পড়ে কিশোরগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা ময়মনসিংহ নিয়ে যেতে বলেন।
''এর আগেও এই এলাকায় দুইটি বাচ্চাকে শিয়ালে মেরে ফেলেছে। শনিবার সন্ধ্যা ৭ টার সময় আমার নাতিকে নিয়ে যেতে চাইছিল। আগে চারপাশে জঙ্গল ছিল তখন শিয়ালে কাউকে কামড় দেয়নি। এখন কোনো জঙ্গল নাই প্রতিবছর কামড়িয়ে বাচ্চাদের মেরে ফেলে। বাচ্চাদের নিয়ে খুবই বিপদে আছি।'' বলছিলেন জোনাকির দাদি।
এই অবস্থায় প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া বলে মনে করছেন গ্রামবাসীরা। প্রতিবেশী রাসেল মিয়া বলছেন, গত দুই বছর যাবত এই এলাকায় দুইজন শিশু শিয়ালের কামড়ে মারা গেছে। একইভাবে জোনাকির মা সময়মতো না যেতে পারলে সেও মারা যেত। প্রশাসনের কাছে আবেদন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখে এলাকায় শিয়ালের ওঁত-পাত কমনোর জন্য ব্যবস্থা নিবেন। একই গ্রামে একের পর এক শিশুদের ওপর এমন ভয়াবহ হামলায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয়রা। দ্রুত প্রশাসন পদক্ষেপ না নিলে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ কামরুল হাসান মারুফ শিয়ালের আক্রমণের উদ্বেগের কথা জানিয়ে এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং করার পাশাপাশি বনবিভাগের পরামর্শে শিয়াল আটক করে অন্যত্র স্থানান্তরের উদ্বোগ নেওয়া হবে বলে জানালেন। সেই সাথে অভিভাবকদে সচেতন থাকতে হবে বলে অভিমত দেন।
শেরপুর বণ্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলছেন, শিয়াল মেরে ফেলার কোনো আইন নেই। তাই অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি স্থানীয় বনবিভাগের সাথে কথা বলে সমাধানের পথ বের করা হবে।

