আগামীর সময়ে সংবাদ প্রকাশের পর মরজিনার ঘর নির্মাণ শুরু

ছবি: আগামীর সময়
বয়স ৬৫ বছর। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও মরজিনা বেগমের জীবনে স্বস্তি আসেনি। ভাঙা ঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, নড়বড়ে বেড়ার ফাঁক দিয়ে ঢোকে বাতাস। বিদ্যুৎ নেই, নেই নিজস্ব পানির ব্যবস্থা কিংবা শৌচাগার। ঝড়-বৃষ্টি এলেই রাত কাটে দুশ্চিন্তায়। বয়সের ভারে চোখের দৃষ্টিও কমেছে। তবু পেটের দায়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করতে হয় তাকে। এমন দুর্দশার কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর এবার তার জীবনে একটু স্বস্তির আশা জেগেছে। শুরু হয়েছে নতুন ঘর নির্মাণের কাজ।
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার আলমবিদিতর ইউনিয়নের পাইকান পীর সাহেবপাড়ায় নদীর তীরের খাসজমিতে বসবাস করেন মরজিনা বেগম। তার দুরবস্থা ও জীবনসংগ্রামের কথা তুলে ধরে গত ২৬ সেপ্টেম্বর দৈনিক আগামীর সময়ে ‘ভাঙা ঘরে মরজিনার দিন-রাত, বয়সের ভারেও থামেনি জীবনসংগ্রাম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর তার পাশে দাঁড়ান উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজন।
তাদের সহযোগিতায় শনিবার (১৭ অক্টোবর) শুরু হয়েছে নতুন ঘর নির্মাণের কাজ।
স্থানীয় সমাজসেবক মোক্তারুজ্জামান সুমন বলেন, ‘মরজিনা আমার ইউনিয়নের বাসিন্দা হলেও তার এমন করুণ পরিস্থিতির কথা আমরা জানতে পারিনি। দৈনিক আগামীর সময়ের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরেছি। পত্রিকাটিকে ধন্যবাদ জানাই। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও এগিয়ে এসেছেন। সবাই যে যার মতো করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোছা. ময়না বেগম বলেন, ‘মরজিনার কষ্ট দেখে আমাদের খারাপ লাগত। সংবাদ প্রকাশের পর তার ঘর নির্মাণ শুরু হওয়ায় আমরা খুশি। আশা করি, এবার তিনি নিরাপদে থাকতে পারবেন।’
মরজিনার জীবনের গল্পটা দীর্ঘদিনের অভাব আর সংগ্রামের। প্রায় ৩৩ বছর আগে স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর একমাত্র মেয়েকে নিয়ে নানা কষ্টে দিন কাটিয়েছেন তিনি। অভাবের মধ্যেও মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মেয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। ফলে নিজের বার্ধক্য সামলানোর পাশাপাশি মেয়ের অসুস্থতার দুশ্চিন্তাও বয়ে বেড়াতে হয় তাকে।
বয়সের কারণে চোখের দৃষ্টি কমে এলেও জীবিকার তাগিদে অন্যের বাড়িতে কাজ করেন মরজিনা। কাজের বিনিময়ে পান তিনবেলা খাবার ও মাসে এক হাজার টাকা। এই সামান্য আয়েই চলে তার জীবন। বৃষ্টির দিনে ঘরের ভেতর পানি পড়লে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। পান করার পানি আনতে হয় অন্যের বাড়ি থেকে। গোসল ও অজুর জন্য যেতে হয় নদীতে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও জীবন থামিয়ে রাখেননি তিনি।
সংবাদ প্রকাশের পর গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জেসমিন আক্তার মরজিনার বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। সরকারি সহায়তা পাওয়ার উপযুক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। পরে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়।
নতুন ঘরটির কাজ শুরু হওয়ায় মরজিনার দীর্ঘদিনের অনিশ্চিত জীবনে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মরজিনা বেগম বলেন, ‘মোর খুব কষ্টের জীবন আছিল। বৃষ্টি হইলে ঘরের ভিতর পানি পড়ছিল, ঝড়ি-হুরকা আসলে ভয়তে ঘুমবার পাং নাই। এই বয়সতও মানুষের বাড়িত কাম করি কোনমতে বাছি আছুং। মোর কষ্টের কথা পত্রিকাত ছাপার পর এ্যালা মোর ঘর বানানোর কাম শুরু হইছে। এ্যালা মুই খুব খুশি ভালো। যারা মোর পাশে দাঁড়াইছেন, সাহায্য করেনছোল, আল্লাহ যেন ওমার ভালো করেন। মুই আল্লাহর কাছোৎ দোয়া করং।’





