আগামীর সময়

ঝিনাইদহে ফুলের বাম্পার ফলন, দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক

ঝিনাইদহে ফুলের বাম্পার ফলন, দাম না পেয়ে হতাশ কৃষক

ছবিঃ আগামীর সময়

মাঠজুড়ে ফুটেছে লাল-হলুদ গাঁদা, গোলাপ আর রজনীগন্ধা। দূর থেকে দেখলে মনে হয় রঙিন এক ফুলের সমুদ্র। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে কৃষকদের হতাশা।

এ বছর ঝিনাইদহে ফুলের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কিন্তু বাজারে মিলছে না দাম। ফলে চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেক ক্ষেতেই ফুল বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে মাঠেই। কৃষকদের দাবি, নির্বাচন ও রমজানকে ঘিরে ফুলের চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফুল উৎপাদনকারী জেলা ঝিনাইদহ। সদর উপজেলার গান্না ইউনিয়ন, কালীগঞ্জ, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ফুলের আবাদ হয়।

ফুলচাষিরা জানান, প্রতিবছর বিজয় দিবস, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে ঘিরে ফুলের চাহিদা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এই সময়টাকে কেন্দ্র করেই সারা বছর ধরে ফুলের যত্ন নেন তারা। ভালো দাম পাবেন এই আশাতেই বিনিয়োগ করেন সার, পানি ও শ্রমিকের পেছনে। কিন্তু এ বছর সেই আশা ভেঙে গেছে। নির্বাচন ও রোজার কারণে অনেক অনুষ্ঠান কম হওয়ায় বাজারে ফুলের চাহিদা হঠাৎ কমে যায়। ফলে উৎপাদন ভালো হলেও দাম পড়েছে তলানিতে।

ঝিনাইদহ সদর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের শাহিনুর খাতুন ও এলেন মণ্ডল দম্পতি এক বিঘা জমিতে গাঁদা ফুলের চাষ করেছেন। পরিবারের পাঁচ সদস্যের জীবিকা এই ফুল চাষের ওপরই নির্ভরশীল। বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তারা আশা করেছিলেন বিশেষ দিবসগুলোতে ফুল বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা লাভ করবেন।

কিন্তু বাজারের ধস তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে। আগে ঝিনাইদহের গান্না ফুল সেন্টারে প্রতি ঝোপা গাঁদা ফুল এক হাজার টাকায়ও বিক্রি হয়েছে। এখন সেই ফুলই বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০ থেকে ১০০ টাকায়।

শাহিনুর খাতুন হতাশ হয়ে বলেছিলেন, ‘অনেক আশা নিয়ে ফুল চাষ করেছিলাম। কিন্তু দাম না থাকায় সব ফুলই প্রায় মাঠেই পড়ে আছে। আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে।’

কেবল তারাই নন, জেলার শত শত ফুলচাষীর অবস্থা এখন একই। কেউ ফুল বিক্রি করতে না পেরে ক্ষেতেই ফেলে দিচ্ছেন। কেউ আবার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়েও কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।

স্থানীয় চাষি ও ব্যবসায়ী দাউদ হোমেন জানান, বর্তমানে বাজারে গাঁদা ফুলের ঝোপা বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়। জারবেরা ফুলের স্টিক ৫ থেকে ৭ টাকা, গোলাপ প্রতি পিস ৫ থেকে ৬ টাকা এবং রজনীগন্ধার স্টিকও বিক্রি হচ্ছে ৫ থেকে ৬ টাকায়।

তিনি বলেছেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার ফুলের দাম অনেক কম। অনেক কৃষক ফুল বিক্রি করতে না পেরে পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।’

গান্না বাজার ফুলচাষী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানিয়েছেন, নির্বাচন ও রোজার কারণে ফুলের বাজারে বড় ধস নেমেছে। সারা দেশেই ফুলের বিক্রি কম হয়েছে। এতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

ফুলের পাইকারি ব্যবসায়ী আশরাফুল জানান, ঝিনাইদহ থেকে ফুল কিনে তারা ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। কিন্তু এ বছর সরকারি দিবস ও বিয়েসহ সামাজিক অনুষ্ঠান কম হওয়ায় ফুলের চাহিদা কমে গেছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক ফুল বিক্রি না হওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে। তবে সামনে ২৬ মার্চে যদি বাজার ভালো থাকে, তাহলে কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

এদিকে কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ কামরুজ্জামান বলেছেন, জেলায় প্রায় ২৮৬ হেক্টর জমিতে গাঁদা, জারবেরা, রজনীগন্ধাসহ বিভিন্ন ফুলের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে গাঁদা ফুলের পরিমাণই সবচেয়ে বেশি।

তবে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতির দাবি তিনি অস্বীকার করে বলেছেন, এবার ফুল কম বিক্রি হয়েছে ঠিকই, তবে কৃষকেরা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হননি। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে যাতে তারা ক্ষতির মুখে না পড়েন।

    শেয়ার করুন: