আড়াই বছরে ৮০ হত্যাকাণ্ডে খুলনা নগর জুড়ে উৎকণ্ঠা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গত বছরের ৩০ নভেম্বর দুপুর সোয়া ১২টা। খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতে কেউ এসেছেন হাজিরা দিতে, কেউ এসেছেন মামলার খোঁজ নিতে। আইনজীবীরা মক্কেলদের শুনানি নিয়ে ব্যস্ত। কোলাহলপূর্ণ এমন পরিবেশ হঠাৎ গুলির শব্দ। প্রাণ বাঁচাতে মোটরসাইকেল রেখে রাস্তায় দৌড় দেয় দুই যুবক। বহু মানুষের সামনে তাদের একের পর এক গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করে বীরদর্পে চলে যায় ঘাতকরা।
শুধু এই ঘটনাটিই নয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে খুলনা মহানগরীতে ৮০ জন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। হত্যাকাণ্ড থেকে রেহাই পায়নি শিশু ও নারীরাও। একের পর এক খুন ও ধারালো অস্ত্রের ঝনঝনানিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় শহরের ১৫ লাখ মানুষ। সবার মধ্যে অজানা আতঙ্ক, কে কখন হামলার শিকার হয়। তবে ভয়ে বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চায় না।
পুলিশের ভাষ্য, মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ এবং পারিবারিক কলহের কারণেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক দলের নেতাদের সহযোগিতা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) জানিয়েছে, খুলনা মহানগরীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৮০ জন খুন হয়েছে। এরমধ্যে ২০২৪ সালে ২৯ জন, ২০২৫ সালে ৩৪ জন এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ৬ জুন পর্যন্ত খুন হয়েছে ১৭ জন।
এদিকে, প্রতিনিয়ত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে লবণচরা ও সোনাডাঙ্গা থানার নারী-শিশুসহ দুটি ট্রিপল মার্ডার ও নগরীর প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়ের রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা মানুষকে শিহরিত করেছে।
নগারবাসীর দাবি, সাধারণ মানুষ বর্তমানে চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। সন্ত্রাসীদের হামলার ভয়ে সন্ধ্যার পর মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পায়।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন কমিটির খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘শান্তির নগরী খুলনা খুনের নগরীতে পরিণত হয়েছে। মূলত পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও সঠিকভাবে মনিটরিং না করায় হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। এ ছাড়া মাদকের সঙ্গে জড়িতরা হত্যাকাণ্ড ঘটনাচ্ছেন। কিন্তু পরিকল্পিত এ সব হত্যাকাণ্ড পুলিশও ঠেকাতে পারছে না।’
তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসলেও খুলনায় কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও খুন-জখমের ঘটনা ঘটছে।’ অবিলম্বে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও তাদের গডফাদারদের গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।
কেএমপির উপকমিশনার (মিডিয়া) আব্দুর রাজ্জাক জানিয়েছে, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবার দমনে গত ৩ জুন থেকে মহানগরীতে বিশেষ যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। গত তিন দিনের অভিযানে মহানগরী থেকে বিভিন্ন অপরাধে ১২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের মধ্যে ‘বি কোম্পানি’র দুইজন রয়েছে।
এদিকে, শনিবার নগরীর খালিশপুরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবির উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, ‘সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া লিটন মীর ওরফে কসাই লিটন ও রিফাত হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের ব্যবহৃত মুঠোফোন এবং অন্য ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে ‘বি কোম্পানি’ নামে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।’





