আগামীর সময়

ঈদ সামনে, তবু মন্দা পাবনার ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গির বাজার

ঈদ সামনে, তবু মন্দা পাবনার ঐতিহ্যবাহী লুঙ্গির বাজার

ছবিঃ আগামীর সময়

তাঁতশিল্প তথা লুঙ্গি বুননে পাবনার ঐতিহ্য বহু পুরোনো। জেলার সদর উপজেলার দোগাছি, কুলুনিয়া, সাদুল্লাহপুর, রাজাপুরের নতুনপাড়া, আটঘরিয়ার চাচকিয়া, লক্ষ্মীপুর, গোপালপুর এবং সাঁথিয়ার বিভিন্ন গ্রামে হাতে ও মেশিনে লুঙ্গি তৈরি হয়। আড়াইশ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দামের লুঙ্গি পাওয়া যায় এখানে। গুণগত মানের কারণে পাবনার লুঙ্গির সুনাম দীর্ঘদিনের।

তবে ঈদ সামনে থাকলেও এবার জমেনি তাঁত কাপড়ের বাজার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সারা বছরের বড় অংশের বিক্রি হয় ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে। কিন্তু এবার সেই চাহিদা নেই। ফলে ঈদের মৌসুমেও তাঁতিদের মুখে হাসি নেই। পাশাপাশি ভারতসহ বাইরের ক্রেতাদেরও এবার হাটে দেখা যাচ্ছে।

পণ্য আছে, ক্রেতা নেই

পাবনার পাশের জেলা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও পাবনার আতাইকুলায় বসে উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে বড় তাঁত কাপড়ের হাট। কয়েক বছর আগেও রমজানে এই হাটে পা ফেলার জায়গা থাকত না। কিন্তু এবার হাটের চিত্র একেবারেই ভিন্ন।

পাবনার কুলুনিয়া গ্রামের তাঁত ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার বলেছেন, ‘আগে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দেড়শ থেকে দুইশ থান (প্রতি থানে চারটি লুঙ্গি) কাপড় বিক্রি হতো। কিন্তু এবার গত তিন-চারটি হাটে তার বিক্রি হয়েছে মাত্র ১২০ থেকে ১৫০ থান।

তিনি বলেছেন, ‘ঈদ সামনে, এখন তো দম ফেলার সময় থাকার কথা। কিন্তু বাজার একেবারেই মন্দা।’

একই অবস্থা দোগাছি গ্রামের পাওয়ারলুম মালিক উজ্জ্বল বিশ্বাসের। তার কারখানায় ৪০টি তাঁত চলে। গত বছর এই সময়ে উৎপাদিত শাড়ি ও লুঙ্গির প্রায় ৯০ শতাংশই দ্রুত বিক্রি হয়ে যেত। এবারও তিনি ১২০টি শাড়ি ও ৩০০টি লুঙ্গি তৈরি করছেন। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ। বাকি পণ্য গুদামে জমে থাকছে।

বাজার মন্দার কারণ

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতাদের অনুপস্থিতি এবং স্থানীয় পাইকারি বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে বাজারে বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে। তাদের মতে, কয়েক বছর আগেও ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের ক্রেতারা নিয়মিত এই হাটে আসতেন। তখন ঈদের বাজার অনেক জমজমাট থাকত। কিন্তু এবার বিদেশি ক্রেতা প্রায় নেই।

ফলে ব্যবসায়ীরা এখন পুরোপুরি দেশীয় পাইকারদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের পোশাকের রুচিতেও পরিবর্তন এসেছে। তরুণরা এখন লুঙ্গির বদলে হাফ প্যান্ট বা ট্রাউজার পরতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এতে লুঙ্গির ঐতিহ্যবাহী বাজারে ধস নেমেছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পরিকল্পনা প্রধান মো. আইয়ুব আলী জানান, দেশে হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত উভয় খাত মিলিয়ে বছরে প্রায় ৮০ কোটি মিটার কাপড় উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে হস্তচালিত তাঁত থেকে আসে প্রায় ৪৭.৭৭ কোটি মিটার। সাধারণত শবে বরাতের পর পাইকারি বাজার জমে ওঠে এবং ঈদের দুই সপ্তাহ আগে খুচরা বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কিন্তু এবার সেই চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

কাঁচামালের দাম বাড়ায় সংকটে তাঁতীরা

তাঁতশিল্পের সংকট আরও বাড়িয়েছে সুতার দাম বৃদ্ধি। কুলুনিয়া গ্রামের তাঁত মালিক আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, ৮০ কাউন্টের এক বেল (১০০ পাউন্ড) সুতার দাম ২৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে এখন ২৭ হাজার ৩০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা হায়দার আলী বলেন, অনেকেই ঈদের আশায় ঋণ নিয়ে উৎপাদনে বিনিয়োগ করেন। কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি জানান, দেশে বর্তমানে হস্তচালিত ও বিদ্যুৎচালিত মিলিয়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ তাঁত সচল রয়েছে। তবে পুঁজি সংকটের কারণে প্রায় ১ লাখ হস্তচালিত তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিপণন) রতন চন্দ্র সাহা জানান, হস্তচালিত তাঁত কমলেও পাওয়ারলুমের সংখ্যা বাড়ছে। দুই খাত মিলিয়ে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ২৮ শতাংশ কাপড় উৎপাদিত হয়। তবে দক্ষ শ্রমিকের অভাব ও লোকসানের কারণে অনেক শ্রমিক পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।

তাঁতীরা বাজার মন্দা হলেও তাঁতপল্লিতে কাজ থেমে নেই। পাবনার কুলুনিয়া গ্রামের তাঁতী শুকুর আলী জানান, সারা বছর দিনে ৫-৬ পিস কাপড় তৈরি করলেও এখন দিনে ১০ পিস পর্যন্ত বুনছেন। দৈনিক প্রায় ৫০০ টাকা আয়ের আশায় তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রম করছেন। তাঁত ব্যবসায়ীদের আশা, ঈদের শেষ মুহূর্তে যদি কেনাকাটার ধুম পড়ে, তাহলে হয়তো কিছুটা লোকসান পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

    শেয়ার করুন: