রাজশাহী অঞ্চল
‘ঢলন’ প্রথায় ডুবছেন আমচাষিরা
- মৌসুমে ক্ষতি ২০০০ কোটি টাকা

রাজশাহীর চার জেলায় ‘ঢলন’ প্রথার কারণে ক্ষতির মুখে আমচাষিরা। ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহী বিভাগের চার জেলায় চলতি মৌসুমে ‘ঢলন’ প্রথার কারণে আমচাষিরা প্রায় ১ হাজার ৮৩৩ কোটি থেকে ২ হাজার ১৩৮ কোটি টাকার বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রশাসন কেজিভিত্তিক বেচাকেনার নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে পাইকারি বাজারগুলোয় চলছে একচেটিয়া আধিপত্য। কৃষকদের ৪০ কেজির মণ হিসাবে দাম পরিশোধ করা হলেও দিতে হচ্ছে ৫২-৫৪ কেজি। এই প্রথার ফলে উৎপাদিত আমের প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা।
রাজশাহী আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর— এই চার জেলায় ১১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৮ টন আম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আমের সম্ভাব্য গড় দাম ৫১ টাকা কেজি হিসাব করলে দেখা যায়, এক মণ আমের দাম দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০ টাকা। কিন্তু প্রতি মণের সঙ্গে ১২-১৪ কেজি অতিরিক্ত দিতে বাধ্য হওয়ায় কৃষকের মাথাপিছু ৬১২ থেকে ৭১৪ টাকা লোকসান হচ্ছে। এই হিসাবে চলতি মৌসুমে মোট আম-বাণিজ্যে কৃষকদের ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। গত সোমবার পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার ৫২ শতাংশ আম বেচাকেনা হলেও চাষিদের এই আর্থিক ক্ষতি অপূরণীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের ভরা সময়ে আম বিক্রির জন্য তাদের প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় পাইকার ও আড়তদারদের ওপর। বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় কৃষকদের দর-কষাকষির সুযোগও কম থাকে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এখনো অধিকাংশ বাজারে ‘ঢলন’ নামে চালু রয়েছে পরিচিত অতিরিক্ত ওজন দেওয়ার প্রথা।
দেশের বৃহৎ আমের পাইকারি বাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে প্রতিদিন হাজার হাজার টন আমের বেচাকেনা হয়। কৃষকদের দাবি, এই বাজারেই ঢলন প্রথার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। একসময় পরিবহন ও সংরক্ষণের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ১-২ কেজি অতিরিক্ত আম দেওয়ার প্রচলন থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়ে গেছে অস্বাভাবিকভাবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার আমচাষি আশরাফুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা ৫২-৫৪ কেজি দিচ্ছি; কিন্তু দাম পাচ্ছি মাত্র ৪০ কেজির। দিতে না চাইলে ব্যবসায়ীরা কিনতেই চান না। বাধ্য হয়েই লোকসানে বিক্রি করতে হয়।’
কৃষকদের এই অবস্থা নিরসনে গত ১১ জুন বিভাগীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঢলন প্রথা বাতিল করে আড়তদারদের কমিশন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কোনো কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় কৃষকরা এখনো জিম্মি— বললেন শিবগঞ্জ আমচাষি সমবায় সমিতির সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম।
বিষয়টিকে কৃষিপণ্য বিপণন ব্যবস্থার বড় দুর্বলতার প্রতিফলন মনে করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওয়াদুদ। তিনি বলছেন, ‘পাইকাররা একদিকে কম দামে আম কিনছেন, অন্যদিকে অতিরিক্ত ওজনও নিচ্ছেন। ফলে কৃষক প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।’
রাজশাহী বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) পাপিয়া রহমান মৌরী জানালেন, প্রশাসনের এক সভায় ঢলন প্রথা বাতিল করা হয়েছে। প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাঠে কাজও করছে।
রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ ন ম বজলুর রশীদের ভাষ্য, ‘বাড়তি ওজনে আম কেনার কোনো সুযোগ নেই। কেজিভিত্তিক বেচাকেনা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’




