টাকা দিলেই খাসজমির মালিক!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৮৯ সাল। কুড়িগ্রাম জেলার পলাশবাড়ীর খাসজমিগুলো ছিল ডোবা-নিচু জলাভূমি। ধীরে ধীরে সেই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয় অন্তত ৬০ হতদরিদ্র পরিবারকে। যাদের ছিল না জমি বা বাড়ি। বরাদ্দ পেয়ে সেই খানাখন্দ-ডোবা ভরাট করে বসবাসের উপযোগী করেন তারা। সরকারি গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পে গড়ে তোলেন নিজেদের বসতি। বছরের পর বছর ধরে সেই জমির জন্য সরকার নির্ধারিত এসএ খাজনাও দিয়ে যাচ্ছেন।
হঠাৎ করেই তারা জানতে পারলেন, এসব জমি আদতে সরকারি নয়। এগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। ফলে ফের ভূমিহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন এসব ‘ভূমিহীন’ পরিবারের সদস্যরা, যার মধ্যে রয়েছেন ভাতা পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাও।
আর এসব পরিবারকে ঝুঁকিতে ফেলে খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় খারিজ বা নামজারি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার সহকারী কমিশনার (এসি ল্যান্ড) আরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। যে কারণে বেহাত হতে বসেছে পলাশবাড়ী মৌজার অন্তত ৭২ একর খাসজমি। অথচ এ বিষয়ে রয়েছে জেলা প্রশাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশ, যেটি অমান্য করেছেন এসি ল্যান্ড।
জেলা প্রশাসনের আর এম শাখা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার এসএ (স্টেট অ্যাকুইজিশন) খতিয়ানের ২০০১, ২০৭৩ এবং ২০৭৪ নম্বর দাগের জমিগুলো ছিল নিষ্কণ্টক ও খাস। এ জমিতেই সরকারের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয় গুচ্ছগ্রাম আবাসন প্রকল্প। ১৯৮৯ সালে সেখানে রেজিস্ট্রি করা কবুলিয়তমূলে (লিখিত দলিল যার মাধ্যমে গ্রহীতা সরকারের নির্ধারিত শর্ত ও খাজনা মেনে জমি ভোগদখলের স্বীকৃতি দিয়েছেন) ১৫টি ভূমিহীন-গৃহহীন হতদরিদ্র পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৯৯ সালে দুটি ব্যারাকে ২০টি পরিবার এবং ২০২১ সালে পাকা ঘর নির্মাণ করে দিয়ে আরও ২৪টি পরিবারকে পুনর্বাসিত করে সরকার। এসব পরিবারের মধ্যে ভাতা পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছেন।
এ ছাড়া ২০০৯ সালে মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক তারামন বিবিকে ওই মৌজায় এক একর খাসজমিতে বাড়ি নির্মাণ করে দিয়ে বন্দোবস্ত দেয় সরকার।
কিন্তু ২০২২ সালের শুরুর দিকে গুচ্ছগ্রামের এসব জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিভিন্ন খতিয়ানে ‘ভ্রমাত্মক (ভুল) রেকর্ডভুক্ত’ হয়। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি চক্র ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বড় অঙ্কের টাকায় ম্যানেজ করে পরিকল্পিতভাবে এসব খাসজমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিভিন্ন খতিয়ানে রেকর্ড করিয়েছে। এরপরই তারা গুচ্ছগ্রামে পুনর্বাসিত বাসিন্দাদের উচ্ছেদের পাঁয়তারা শুরু করে। গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দারা জেলা প্রশাসনে লিখিতভাবে রেকর্ড সংশোধনের আবেদন জানান।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে এসি ল্যান্ডকে চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন। সেখানে আরএস রেকর্ড সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত জমির (এসএ ২০০১, ২০৭৩ ও ২০৭৪ দাগের) সরকারি ভূমি উন্নয়ন করসহ যাবতীয় কার্যক্রম এসএ রেকর্ড অনুযায়ী চলমান রাখতে বলা হয়।
শুরুতে কিছুদিন এ নির্দেশনা মেনেও চলা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাসে বর্তমান এসি ল্যান্ড আরিফুল ইসলাম যোগ দেওয়ার পর ঘটে বিপত্তি। তিনি গুচ্ছগ্রামের খাসজমি আরএস রেকর্ড অনুযায়ী ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করতে শুরু করেন। নিরুপায় হয়ে গুচ্ছগ্রামবাসী ফের জেলা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের মার্চেও একই নির্দেশ জারি করে এসি ল্যান্ডকে চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন। কিন্তু সেই নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করতে থাকেন এসি ল্যান্ড। তার দাবি, জেলা প্রশাসনের কোনো চিঠি তিনি পাননি।
গুচ্ছগ্রামবাসী অভিযোগ করে বললেন, অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এসি ল্যান্ড, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা, সার্ভেয়ার এবং সদর ভূমি অফিসের একাধিক কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশ করছে একদল ব্যক্তি। এই কর্মকর্তারা মূলত ওই সব ব্যক্তির হয়েই কাজ করছেন।
আগামীর সময়ের অনুসন্ধানেও খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় খারিজ করে দেওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে।
যাদের নামে এসব খাসজমি নামজারি করা হয়েছে, তাদের তিনজনের নাম ও একজনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় জানতে পেরেছে আগামীর সময়।
জানা গেছে, আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার ৪০ শতক জমি নামজারি হয়েছে নুর আব্দুলের নামে, ১ একর ৪ শতক জমি আবুল হোসেনের নামে এবং ১ একর ৯ শতক জমি নামজারি হয়েছে সেকেন্দার আলীর নামে।
তাদের মধ্যে শুধু আবুল হোসেনের পুরো পরিচয় জানা গেছে। তার বাড়ি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়া এলাকায়। ৫০ বছর বয়সী এই ব্যক্তি পেশায় একজন ব্যবসায়ী।
খাসজমি তাদের নামে খারিজ হলেও তারা কেউই প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন। ফলে কোন সূত্রে বা কোন প্রভাবে তাদের নামে জমি খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। স্থানীয়রা অবশ্য বলছেন, অর্থের বিনিময়ে চলছে এই লেনদেন।
বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানায় খারিজ করা প্রায় পৌনে ৩ একর খাসজমির ভূমি উন্নয়ন কর আদায়ের প্রমাণ আগামীর সময়ের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা গেছে, আরাজি পলাশবাড়ী মৌজার এসএ ২০০১ ও ২০৭৪ দাগের একাধিক খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি করে দিয়েছেন এসি ল্যান্ড আরিফুল ইসলাম, যা সরাসরি জেলা প্রশাসনের নির্দেশের বিপরীত।
এখন বন্দোবস্ত দেওয়া জমি ও বাসস্থান হারানোসহ উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটছে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের। সেই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও।
কথা হয় গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আজিমের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, ‘সরকার যখন জমি দিছে, তখন ছিল খাল। ভরাট করি বসবাস শুরু করছি। এলা এসি ল্যান্ড অন্যজনকে জমি দিবার লাগছে।’
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ফারুক নামের আরেকজন। তিনি জানালেন, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনার পর জমির খাজনা দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু আগের মতো এসএ অনুযায়ী খাজনা নিচ্ছে না। শোনা যাচ্ছে, অর্থের বিনিময়ে এই জমি অন্যদের নামে খারিজ করে দেওয়া হচ্ছে।
অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন গুচ্ছগ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হাছেন আলী। তিনি বললেন, ‘এমন কেউ নাই যে আমাদের দেখবে। সরকার জমি দিছে, ঘর দিছে। বন্দোবস্ত দেওয়া খাসজমি কীভাবে অন্যদের দিল, এই প্রশ্ন আমাদেরও।’
একই প্রশ্ন রাখেন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারও। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে কথা হয় পৌর ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আব্দুল হাকিম শেখের সঙ্গে। তিনি জানালেন, চিঠির বিষয়টি তার জানা নেই। তবে প্রয়োজন পড়লে নামজারি বাতিল করা হবে।
অবশ্য দুদিন পর এই বক্তব্য থেকে সরে আসেন তিনি। বললেন, ‘আরএস গেজেট হওয়ায় এসএ খতিয়ান অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন কর নেওয়ার সুযোগ নেই।’
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে কথা হয় এসি ল্যান্ড আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। তার ভাষ্য, ‘আরএস রেকর্ড অনুযায়ী নামজারি করা হচ্ছে। নামজারি করার সময় আমরা এসএ রেকর্ড দেখি। যেখানে সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত রাখা হয়।’ তাহলে কীভাবে খাসজমি ব্যক্তিমালিকানায় নামজারি হচ্ছে, জানতে চাইলে এই প্রশ্নের উত্তর দেননি তিনি।
জেলা প্রশাসনের চিঠি পাননি জানিয়ে আরিফুল বললেন, ‘পেলেও বিষয়টি বিধিসম্মত নয় জানিয়ে উত্তর লিখতাম। আরএস গেজেট হওয়ার পর এসএ অনুযায়ী কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই।’
খোদ সরকারও আরএস রেকর্ড প্রকাশ হওয়ার পর এসএ রেকর্ড অনুযায়ী খাসজমিতে গুচ্ছগ্রাম গড়ে তুললেও সেটি সম্ভব নয়, যোগ করেন তিনি।
এ ঘটনার আইনি জটিলতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আজিজুর রহমান দুলু বললেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে এসি ল্যান্ড অসদাচরণ করেছেন। সরকার তাকে দায়িত্বে বসিয়েছে সরকারি স্বার্থ রক্ষার জন্য। আরএস রেকর্ড হলেও জমিতে সরকারি স্বার্থ থাকলে নামজারি স্থগিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা উচিত।’ সরকার পক্ষ এবং বন্দোবস্ত পাওয়া ব্যক্তিদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শও দিলেন এই আইনজীবী।




