হাসপাতালেই ‘শান্তির’ ৭ মাস, এবার কোথায়?

নেই বাবার বাড়ি। ঠাঁই হয়নি স্বামীর বাড়িতেও। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দিতে সদর হাসপাতালে হয়েছিলেন ভর্তি। এর পর থেকে দুই সন্তান নিয়ে হাসপাতালেই রয়ে গেছেন শান্তি বেগম।
বরগুনা সদরের পরীরখাল এলাকার গৃহবধূ শান্তি। সাত মাস ধরে থাকছেন সরকারি হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের একটি বেডে। ‘মানবিক কারণে’ এতদিন আশ্রয় দিলেও এখন শয্যা সংকট, তাই তাকে হাসপাতাল ছাড়তে বলেছে কর্তৃপক্ষ। আড়াই বছরের মেয়ে আয়েশা ও সাত মাসের ছেলে আয়াতকে নিয়ে শান্তির মুখে একটাই প্রশ্ন- ‘কোথায় যাব?’
বিষয়টি সমাজসেবা অধিদপ্তরের নজরে আনার কথা জানিয়েছেন হাসপাতালের কর্মকর্তারা।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়েই দেখা মিলল এই নারীর। নানা রোগী-স্বজনের ভিড়ে একটি সিঙ্গেল বেডে চুপচাপ বসে তিনি। কোলে ছোট্ট আয়াত। মায়ের গা ঘেঁষে বসা আয়েশা।
সাংবাদিক পরিচয় দিতেই ছলছল চোখে জীবনের সব অশান্তির কথা অনর্গল বললেন শান্তি। জানালেন, বাবা হারিয়েছেন জন্মের আগেই। মায়ের মৃত্যু তার সাত বছর বয়সে। ছোট্ট শান্তির আশ্রয় হয় সদরের হেউলী বুনিয়া এলাকায় নানাবাড়িতে। সেখানে ‘সৎ নানি ও মামাদের নির্যাতনে’ তার বেড়ে ওঠা।
‘আট বছর বয়সে অন্যের বাড়িতে কাজ শুরু করি। পরে ঢাকায় গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ নেই। ভালোই ছিলাম কয়েকদিন। তারপর করোনার সময় গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যায়। আবার গ্রামে নানার বাড়িতে চলে আসি।’
পরিবারের চাপে পরীরখাল এলাকার মো. খলিলের সঙ্গে বিয়ে হয় শান্তির।সেখানেও পারিবারিক কলহে অশান্তি।
এরপর সরকারি হাসপাতালে কেন? এ প্রশ্নে শান্তির ভাষ্য, ‘গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে দেড় বছরের মেয়েসহ মারধর করে বের করে দেয় আমার স্বামী। তখন আমার পেটে ছয় মাসের বাচ্চা। চিকিৎসার জন্য আমি বরগুনা সদর হাসপাতালে আসি। আমার ছেলের জন্ম হয় এখানে।'
‘সুস্থ হয়ে দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তবে স্বামী বাড়িতে ছিল না। আমার ভাসুর ও তার স্ত্রী ঘরে উঠতে দেয়নি। বাবার বাড়িও নাই আমার। কোথাও যাওয়ার জায়গাও ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ফিরে আসি’- ব্যাখ্যা দিলেন শান্তি।
‘হাসপাতালের নার্সদের দয়ায় শিশুদের একটা বেডে থাকার সুযোগ পাই। নার্সরা আমার বাচ্চাদের খাবার কিনে দিতেন, আর হাসপাতাল থেকে আমাকে খেতে দেওয়া হতো। এখন কর্তৃপক্ষ আমাকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যেতে বলেছে। আমি কোথায় যাব? এই দুইটা সন্তানকে আমি কী খাওয়াব? বাচ্চারা খেতে না পেরে হয়তো আমার হাতেই মারা যাবে’- শঙ্কা তার।
সদর হাসপাতালের নার্স সাবিনা আক্তার জানালেন, সাত মাস ধরে সেখানে আছেন শান্তি।
‘ওই মহিলা দুটি ছোট্ট শিশুসন্তান নিয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে থাকেন। তাদের পরিবারের কোনো সদস্য খোঁজখবর নিচ্ছেন না। ওই মহিলার কোনো টাকা-পয়সাও নেই। তাই ওই শিশুদের দুধসহ অন্যান্য খাবার ও কাপড়চোপড় কেনার জন্য আমরা নার্সরা সহযোগিতা করতাম।’
সরকারি হাসপাতালে আশ্রয় দেওয়ার কারণ হিসেবে ‘মানবিক দিক’ তুলে ধরলেন বরগুনা ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম।
‘অসহায় ওই নারীকে হাসপাতাল থেকে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। মানবিক কারণে দুই শিশুসন্তান নিয়ে তিনি এখানে ছিলেন। তবে আমরা তাকে আর কতদিন রাখতে পারব! এমনিতেই রোগীদের ঠিকমতো বেড দিতে পারছি না। তাই শান্তিকে হাসপাতাল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে আমি সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাছে দাবি জানাব, ওই অসহায় মহিলার জন্য তারা যেন পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে।’
শান্তির স্বামী খলিলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তিনি সাংসারিক অশান্তির জন্য দায়ী করলেন শান্তিকেই। জানালেন, ফিরিয়ে নেবেন না স্ত্রীকে।
‘আমার প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক কলহের কারণে ছাড়াছাড়ি হয়। এরপর শান্তিকে বিয়ে করি। এই সংসারেও ঝগড়া লেগে থাকে। আমি বালুশ্রমিক। বেশিরভাগ সময় বালুর বলগেটে থাকি। আমার এই স্ত্রী আমাকে মারধর করে। জীবনের নিরাপত্তার জন্য তাকে আমি ঘরে তুলব না।’ এ প্রসঙ্গে আর কোনো কথা বলতে বা শুনতে নারাজ তিনি।
শান্তির সামনে এখন ফের অশান্তির দিন আর টিকে থাকার লড়াই। সঙ্গে যোগ হয়েছে দুই সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। নেই স্বামীর বিরুদ্ধে আইনিব্যবস্থা নেওয়ার সামর্থ্য।
তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী রনজু আরা শিপু সব শুনে দিলেন ভরসা। বললেন, ‘জেলা জজ কোর্টের লিগ্যাল এইড অফিসে লিখিত অভিযোগ করলে ওই অসহায় নারী লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনি সহায়তা পাবেন। ফিরে পাবেন তার ন্যায্য অধিকার।’
নারীদের জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, উপকূলীয় এলাকায় ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে পারিবারিক জীবনে।
স্থানীয় নারীদের নিয়ে কাজ করে বেসরকারি সংগঠন ‘জাগো নারী’। এর প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা হাসির মতে, ‘বরগুনা উপকূল বারবার বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। এ কারণে এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। এতে পারিবারিক কলহ ও সহিংসতা বাড়ছে। আমি সরকারের কাছে দাবি জানাই, ওই অসহায় মহিলাকে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর দেওয়ার। পাশাপাশি শিশুদের জীবন সুরক্ষার জন্য সরকার যেন উদ্যোগ নেয়।’
সংগঠনের পক্ষ থেকে শান্তি বেগমের খোঁজখবর নিয়ে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন হোসনে আরা। শান্তিকে স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানালেন তিনি।
‘এ ছাড়াও যেসব লোকজন অসহায় ব্যক্তিদের সহযোগিতা করেন, আমরা তাদের কাছেও তার জন্য সহযোগিতা চাইব। তবে এসব সমাধানে এলাকাভেদে সরকারের আলাদা বাজেট থাকা প্রয়োজন’ মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আজিজও দিলেন আশ্বাস, ‘ভুক্তভোগী নারী লিখিত অভিযোগ দিলে গ্রাম আদালতের মাধ্যমে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি সমাধান করা হবে।’
সরকারি হাসপাতালে ওই গৃহবধূর আশ্রয় নেওয়ার তথ্য জানা ছিল না- ভাষ্য বরগুনা সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. হেমায়েত উদ্দিনের। তিনি বললেন, ‘ওই নারী জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে আবেদন করলে ভালো সমাধান হবে। তার যেহেতু ছোট ছোট দুটি বাচ্চা রয়েছে এবং থাকার কোনো জায়গা নেই, তাই তাকে আগে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেওয়া জরুরি। এরপর হয়তো আমাদের পক্ষ থেকে কিছু করার সুযোগ থাকবে।’





