মাশরুমের বীজ উৎপাদন করে উদ্যোক্তা ওডিস

মাশরুম চাষ করে সফল খাগড়াছড়ির তরুণ ওডিস চাকমা। ছবি: আগামীর সময়
স্নাতক পাস করে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেই উদ্যোক্তা হয়েছেন খাগড়াছড়ির তরুণ ওডিস চাকমা। মাশরুম চাষ দিয়ে শুরু করে এখন নিজ বাড়িতে টিস্যু কালচারের মাধ্যমে মাশরুমের বীজ উৎপাদন করছেন তিনি। নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি তার উদ্যোগে কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে গ্রামের দুই নারী ও তিন পুরুষের।
খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের পাকুজ্যাছড়ি গ্রামে ওডিসের বাড়ি। প্রায় ১২ বছর আগে মাশরুম চাষ শুরু করেন তিনি। তখন ঢাকা থেকে বীজ এনে চাষ করতেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আনার কারণে বীজের মান নষ্ট হওয়ায় বারবার লোকসানে পড়তে হয়েছে তাকে।
মাশরুম চাষ ও টিস্যু কালচারে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণও ছিল না তার। পড়াশোনা ও অনলাইনে তথ্য সংগ্রহ করে কাজ শুরু করলেও শুরুতে নানা ক্ষতির মুখে পড়েন। তবে হাল ছাড়েননি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেন।
গত বৃহস্পতিবার পাকুজ্যাছড়ি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ওডিসের রয়েছে টিস্যু কালচারের জন্য আধুনিক একটি পরীক্ষাগার। সেখানে তিনি নিজেই মাশরুমের বীজ উৎপাদনের কাজ করেন। বাড়ির উঠানের একটি ঘরে গাছের গুঁড়া ও গমের ভুসি মেশানোর যন্ত্র, খড় সিদ্ধ করার ড্রামসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম রয়েছে। পাশেই আছে মাশরুম চাষের তিনটি শেড। গাছের গুঁড়া ও গমের ভুসি প্রক্রিয়াজাত করার পর মেঝেতে ছড়িয়ে ঠান্ডা করার কাজ করছিলেন শ্রমিকরা।
ওডিস চাকমা জানালেন, তিনি মূলত রেডিমেড স্পন বা মাশরুমের বীজ বিক্রি করেন। চাষিরা এসব বীজ কিনে খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে মাশরুম উৎপাদন করেন। প্রতিদিন তার ৩০০টি রেডিমেড স্পন তৈরির সক্ষমতা রয়েছে। প্রতিটি স্পন বিক্রি করেন ৫০ টাকায়।
তিনি জানান, সারা বছর মাশরুম উৎপাদন করা গেলেও শীতকালে চাষ বেশি হয়। গ্রে ওয়েস্টার, ভুটানিজ ও কান মাশরুম সারা বছর চাষ করা যায়। অন্যদিকে ওএস ও এইচকে-৫১ জাতের মাশরুম মূলত শীতকালে উৎপাদন করা হয়। বিক্রির পর কোনো বীজ উদ্বৃত্ত থাকলে তা দিয়ে নিজেই মাশরুম চাষ করেন।
পাহাড়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো মাশরুমের প্রচলন রয়েছে। ফলে চাষ করা মাশরুমেরও চাহিদা আছে। ওডিস বললেন, যাদের মাশরুম চাষে অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা এ কাজে বেশি লাভবান হন।
নিজের চাষের অভিজ্ঞতা থেকে ওডিস বুঝতে পারেন, স্থানীয়ভাবে বীজ উৎপাদন করতে পারলে বাইরে থেকে বীজ আনার ঝামেলা ও মান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমবে। এ চিন্তা থেকেই পাঁচ বছর আগে মাশরুমের টিস্যু কালচারের জন্য পরীক্ষাগার স্থাপন করেন তিনি। এ কাজেও প্রথম দিকে লোকসান গুনতে হয়েছে। পরে অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিস্থিতি সামলে ওঠেন।
তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে তার। ওডিস চাকমা জানান, আগে গাছের গুঁড়ার এক বস্তার দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা, এখন তা বেড়ে ১৫০ টাকা হয়েছে। গমের ভুসির দাম ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার টাকা হয়েছে। পাঁচ পাউন্ড পলিথিনের দামও ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। এসব কারণে মাশরুম উৎপাদনের খরচ বেড়েছে।
স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ওডিসের সংসার। মাশরুমের বীজ উৎপাদন ও চাষই এখন তার প্রধান পেশা। পাশাপাশি রয়েছে ফলের বাগান ও সবজির ক্ষেত। নিজের উদ্যোগ, অধ্যবসায় ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেমন স্বাবলম্বী হয়েছেন, তেমনি স্থানীয় পাঁচজনের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি করেছেন।




