পান ভাণ্ডার থেকে শিক্ষার আলো

কোলাজ: আগামীর সময়
জংশনের পাশে জরাজীর্ণ টং। আফজাল আলীর ‘জেমি পান ভাণ্ডার’। মেয়ের নামে পান বিক্রেতা বাবার দোকানের নামকরণ। সেই ছোট্ট নামটি আজ বাবার দোকানে আলো ছড়িয়েছে। দেশজুড়ে জ্বলছে।
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের পশ্চিম লেঞ্জাপাড়া গ্রামের আফজাল আলী ও আকলিমা আক্তার দম্পতির কন্যা জান্নাতুল ফেরদৌস ৬০ হাজার ডলারের বৃত্তি পেয়েছে। বাংলাদেশি প্রায় ৭৫ লাখ টাকা। এই টাকায় গড়বে ভবিষ্যৎ, গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়াতে চায় জেমি।
স্থানীয় জহুরচান বিবি মহিলা কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ না পাওয়ায় মনখারাপ হয় তার। এরই মধ্যে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন (এইউডব্লিউ) থেকে ভর্তির আমন্ত্রণপত্র আসে। এতে জানানো হয়েছে, আগামী চার বছরের স্নাতক কোর্স তাকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়ানো হবে। শেষ পর্যন্ত এই অধ্যয়নের ব্যয় ৬০ হাজার মার্কিন ডলার বা ৭৫ লক্ষাধিক টাকা।
জেমির বাবা আফজাল আলী শায়েস্তাগঞ্জের লেঞ্জাপাড়ার বাসিন্দা এবং একজন রেল জংশন এলাকার অটোরিকশা স্ট্যান্ডের সামনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও কলেজ কর্তৃপক্ষের সহায়তায় জেমি জহুর চান বিবি মহিলা কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
আফজাল আলী অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন, শুধু চেয়েছিলাম মেয়েকে লেখাপড়া করিয়ে কোনো রকম একটা চাকরি করিয়ে বিয়ে দেব। কিন্তু আমার মেয়ে এত বড় অর্জন এনে দেবে, ভাবতেও পারিনি। ধন্য হয়েছে আমার পরিশ্রম। জেমির জন্য তার মা ও শিক্ষকবৃন্দ অনেক করেছেন। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।
দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় জেমি। ছোট ভাই জিসান সামনের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও অবুঝ পাঁচ বছরের ইশান আহমেদ। জেমি ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ায় ভালো ছিল বিধায় বাবা পান বিক্রি করে পড়িয়েছেন তাকে।
পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোকানে সারাদিন বসে ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হতো। সেই টাকার বড় অংশ যেত জেমির বই, খাতা-কলম কেনা ও অন্যান্য পড়ার খরচে। বাকি টাকায় চলত টানাপোড়েনের সংসার। সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন তার শিক্ষকরাও। বেতন মওকুফ করে পরীক্ষার ফিও প্রতিষ্ঠান থেকেই দেওয়া হতো।
ছোট্ট কুঁড়ে ঘর থেকে জেমির বড় অর্জনকে টাকার মাপকাঠিতে ফেলেছেন প্রতিবেশীদের অনেকেই। তাদের ভাষ্য, ধন্য আফজাল চাচার মেয়ে সন্তান। এবার তার ঘরে অভাব বলতে কিছু থাকবে না। বলছিলেন লেঞ্জাপাড়ার ওয়ার্কশপ শ্রমিক শাহজাহান মিয়া।
জহুর চান বিবি কলেজের অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আল মামুন জানালেন, বিশ্ববিদ্যালয় এক শ জন মেধাবী ছাত্রীকে নিয়ে এক মাসের জীবনমুখী প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সেখানে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতা, বিজ্ঞান, গণিত, অভিনয় ও সাধারণ জ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাতজন বৃত্তি পেয়েছে। তাদের দুজনের পুরোপুরি ফি মওকুফ করা হয়েছে। তাদের একজন জেমি।
জেমি বর্তমানে চট্টগ্রামে রয়েছেন। শিগগিরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের কাছ থেকে তার পুরস্কার নেওয়ার কথা বলেও জানান তিনি।
সেখান থেকে পিতামাতা, শিক্ষক ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হচ্ছে। জেমির ভাষ্য, পিতামাতার পরিশ্রম, দারিদ্র্য ও সমাজের কুসংস্কার মোকাবিলা করতে হয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে তার মতো যেন কোনো মেয়ে শিক্ষা অর্জনে প্রতিবন্ধকতায় না পড়ে, তার জন্য কাজ করবেন তিনি।
শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সাংবাদিক ও শিক্ষক জালাল উদ্দিন রুমী বলেন, আফজাল ভাইকে তরুণরা আফজাল চাচা ডাকেন। সেই হিসেবে বলা হয় আফজাল চাচার পান ভাণ্ডার। শখ করে মেয়ের নামে ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বয়সের ভারে ঝরে পড়েছে সেই সাইনবোর্ড। কিন্তু সেই মেয়েটি আজ দোকান আলোকিত করল।
হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ বলেন, খবরটি শুনে আনন্দিত হয়েছি। জেলা প্রশাসন তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। আমরা সবসময় জেমির পাশে থাকব।






