ছয়টি সায়ন থেকে ৭৫ বিঘার বাগান, কল্যাণভোগে ভাগ্য ফিরছে আমচাষিদের

ছবি: আগামীর সময়
মাত্র ছয়টি সায়ন বা ডগা দিয়ে শুরু। সেই ছয়টি সায়ন থেকেই কয়েক বছরের ব্যবধানে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে গড়ে উঠেছে ৭৫ বিঘার কল্যাণভোগ আমের বাগান। শুধু আম বিক্রি নয়, সায়ন ও চারা বিক্রি করেও আয় করছেন চাষিরা। স্বাদে, আকারে ও দামে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া এই আম নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে স্থানীয় আমচাষে।
২০১৭ সালে ভারত থেকে ছয়টি সায়ন এনে হর্টিকালচার সেন্টারের মাইনুল ইসলাম গোমস্তাপুরের আমচাষি রবিউল ইসলামের মাধ্যমে শুরু করেন এই আমের চাষ। এরপর ধীরে ধীরে এর চাষ ছড়িয়ে পড়ে। রবিউলের পাশাপাশি আশপাশের কয়েকজন চাষি অন্তত আরও ৫০ বিঘা জমিতে করেছেন কল্যাণভোগ আমের বাগান। সায়ন বিক্রির মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে এ জাতের আম।
গোমস্তাপুরের খয়রাবাদ এলাকায় রবিউল ইসলামের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সাত থেকে আট বছরের ছোট ছোট গাছে ঝুলছে কল্যাণভোগ আম। প্রতিটি আমের ওজন ২৫০ থেকে ৬০০ গ্রাম। একটি ডগায় অন্য অনেক জাতের মতো একটি নয়, একাধিক আম ধরে। প্রতিটি আমের গড় ওজন প্রায় ৩০০ গ্রাম। আমের আঁটি ছোট এবং শাঁস খাওয়ার উপযোগী অংশও বেশি। ডাঁটা মোটা হওয়ায় পোকামাকড়ের আক্রমণে ক্ষতি তুলনামূলক কম হয় বলে জানান চাষিরা। তাদের দাবি, অন্য অনেক জাতের তুলনায় এই আম উৎপাদনে খরচও কম।
কল্যাণভোগ আমের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মৌসুমের শেষ দিকে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে পাওয়া যায় এটি। এ সময় বাজারে অন্য জাতের আম কম থাকায় দামও বেশি পাওয়া যায়। তবে মূল মৌসুমে বাজারে বিভিন্ন জাতের আম থাকায় তখন এর দাম তুলনামূলক কম থাকে।
রবিউল ইসলামের বাগানে এবার প্রায় ১০০ মণ আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এর বেশির ভাগই বাগান থেকে অনলাইনে বিক্রি হয়ে যায়। রবিউল জানান, গত আট থেকে দশ দিনে প্রায় ৩০ মণ আম বিক্রি করেছেন। আরও প্রায় ৭০ মণ আম বিক্রির অপেক্ষায় রয়েছে। এবার প্রতি মণ আম ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন তিনি। কেজিপ্রতি দাম পড়ছে প্রায় ৩৪০ টাকা।
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি শুধু আম বিক্রি করি না, সায়ন ও চারাও বিক্রি করি। সায়ন ও চারা বিক্রি করে আমের চেয়েও বেশি টাকা পাই। আগামীতে আরও বাগান বাড়ানোর চিন্তা আছে।’ তার ভাষ্য, কৃষি বিভাগ, কল্যাণপুরের হর্টিকালচার সেন্টার ও জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আমটির নাম রাখা হয়েছে কল্যাণভোগ।
আম বিক্রির পাশাপাশি সায়ন ও চারা বিক্রিও রবিউলের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার সায়ন বিক্রি করেছেন। আরও ২০ হাজার সায়ন বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি সায়ন ১৫ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই বছর আগে দাম আরও বেশি ছিল। এ ছাড়া এ পর্যন্ত প্রায় ৩২ হাজার চারা বিক্রি করেছেন তিনি। প্রতিটি চারার দাম ১৫০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত।
কল্যাণভোগের স্বাদে মুগ্ধ হয়ে নতুন বাগান গড়তে আগ্রহী হচ্ছেন অন্য এলাকার চাষিরাও। শিবগঞ্জের বাসিন্দা এবং চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাবেক প্রধান শিক্ষক জালাল উদ্দিন রবিউলের বাগান থেকে চারা নিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিন মাস আগে ১০০টি চারা নেব বলেছিলাম। সে অনুযায়ী আজ চারা নিতে এসেছি। আমার আরও বাগান আছে। সেই বাগানের ফাঁকা জায়গাগুলোতে কল্যাণভোগ আমের চারা রোপণ করব। আগে আমটি খেয়ে দেখেছি, অসাধারণ স্বাদ। সেই স্বাদ দেখেই চারা রোপণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
নওগাঁর সাপাহার থেকে সায়ন নিতে এসেছিলেন কামাল পাশা ও সবুর মাস্টার। কামাল পাশা বলেন, ‘আগে তিন হাজার চারা নিয়ে গিয়ে বাগানে কলম করেছি। আমার বাগানে আরও কলম করব। তাই আজ পাঁচ হাজার সায়ন নিতে এসেছি। দেখেছি, শুনেছি এবং আমটি খেয়েছি। অসাধারণ সুস্বাদু, ক্ষীরসাপাত আমের মতো।’
হর্টিকালচার সেন্টারের মাইনুল ইসলাম জানান, ২০১৭ সালে ভারত থেকে ছয়টি সায়ন এনে রবিউল ইসলামের মাধ্যমে আমটির চাষ শুরু হয়। এরপর এর উৎপাদন, প্রচার ও নামকরণে কয়েক বছর সময় লেগেছে। রবিউলের কাছ থেকে সায়ন কিনে জোইট্যাবটলায় বাবু চার বিঘা এবং সুলতানগঞ্জের শিক্ষক মরিফুল ইসলাম ৩৫ বিঘা জমিতে কল্যাণভোগ আমের বাগান করেছেন। মাইনুল ইসলামের ভাষ্য, আমচাষিরা এই জাতের আম উৎপাদন করতে পারলে তাদের লাভবান হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।
গোমস্তাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাকলাইন হোসেন বলেন, ‘কল্যাণভোগ আমটি দেরিতে পাকে। এর মিষ্টতা অনেক বেশি। অন্য আমের তুলনায় কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন, ভোক্তারাও এটি গ্রহণ করেছেন। রবিউল ইসলামের উদ্যোগে আমটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই।’
চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কমবেশি আমবাগান বা আমগাছ রয়েছে। তবে পুরোনো অনেক জাতের আমের দাম কমে যাওয়ায় চাষিরা লোকসানের মুখে পড়েছেন। গত পাঁচ বছরে অনেকে বেশি দামের আশায় জাত পরিবর্তনের দিকে ঝুঁকেছেন। এ জন্য নতুন করে গাছ না লাগিয়েও পুরোনো গাছে সায়ন সংযোজন বা কলমের মাধ্যমে জাত পরিবর্তন করছেন তারা।
কয়েক বছর ধরে কল্যাণভোগের পাশাপাশি ব্যানানা, গৌড়মতি, বারি-৪, আম্রপালি ও কাটিমনের মতো জাতের চাষও বাড়ছে। অন্যদিকে লখনা, আশ্বিনা, ফজলি, মোহনভোগ, দাইদভোগ ও বোগলাগুটি জাতের অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। পুরোনো জাতের আমের ব্যবসায় লোকসান গুনে এ পেশা ছেড়েছেন অনেক চাষি ও ব্যবসায়ী। নতুন জাতের আমের চাহিদা ও ভালো দামের সম্ভাবনা তাদের আবার করছে বাগানমুখী।




