শেরপুর থেকে সংসদে ‘ঝগড়ারচর’

ছবি: আগামীর সময়
এককালে নাম ছিল গোবিন্দগঞ্জ।উনিশ শতকের কোনো এক সময় লোকমুখে বদলে তা হয়ে গেল ‘ঝগড়ারচর’। এই নামবদলের পেছনে নাকি আছে ঝগড়ার ইতিহাস। জাতীয় সংসদে স্পিকারের রসিকতার পর এই নাম এখন ঘুরছে ফেসবুকে।
জাতীয় সংসদে গতকাল রবিবার চলছিল বাজেট অধিবেশন। কথা বলার পালা শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী- ঝিনাইগাতী) আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেলের। শ্রীবরদীর ‘ঝগড়ারচর’ বাজারে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান তিনি।
কারণ হিসেবে এমপির ব্যাখ্যা, শেরপুর ও জামালপুরের তিন এলাকার সীমানায় অবস্থিত এই ঝগড়ারচর বাজার। এসব এলাকার লোকজনের নিয়মিত যাতায়াত সেখানে; আছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও। প্রায়ই বাজারটিতে চুরি-ডাকাতি-খুনসহ নানা হট্টগোল ঘটে। থানা পুলিশের অবস্থান বাজার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এ কারণে ঝগড়ারচর বাজারে প্রয়োজন একটি পুলিশ ফাঁড়ি— বললেন এমপি রুবেল।
তার বক্তব্য শেষ হতেই স্বভাবসুলভ রসিকতায় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রম বলে উঠলেন, ‘জায়গার নাম হলো ‘ঝগড়ারচর’, সেখানে তো ঝগড়াই হবে। পুলিশ গিয়ে কী এই ঝগড়া থামাতে পারবে!’
আলোচিত ১০ (৮ জুন ২০২৬)
০৮ জুন ২০২৬
এই ভিডিওক্লিপ ফেসবুকে প্রচারের পর দেখা গেছে ‘ঝগড়ারচর’ নিয়ে রিলস, মিম ও কার্টুনের বিভিন্ন ফানপোস্ট (মজার ছলে দেওয়া পোস্ট)। অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাজারের এই নামকরণ নিয়ে কৌতুহল।
‘ঝগড়ারচর’ বাজারটি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ৭ নম্বর ভেলুয়া ইউনিয়নের বারারচর গ্রামে। শেরপুর ও জামালপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাট হিসেবে পরিচিত এটি। এর পশ্চিমে ও উত্তরে জামালপুরের ইসলামপুর ও বকশীগঞ্জ উপজেলা এবং দক্ষিণে শেরপুর সদর উপজেলা। পাকা সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকায় আশপাশের গ্রামগুলোর জন্য বাজারটি হয়ে উঠেছে গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল বাজার এলাকার এই নামকরণের একটি গল্প। তাদের মতে, এক সময় বাজারটির নাম ছিল ‘গোবিন্দগঞ্জ’। উনিশ শতকের মাঝামাঝি কোনো একসময় বাজার স্থানান্তরের আলোচনা ওঠে।
শিমুলচড়া গ্রামের মনোয়ার হোসেন (জমিদার) বলছিলেন, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম— বাজারটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হওয়ার সময় বাউশমারী-কড়ইতলা এলাকার বাসিন্দা ও নতুন স্থানের লোকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ ও ঝগড়া হয়েছিল। সেই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই এলাকাটি পরবর্তী সময়ে ‘ঝগড়ারচর’ নামে পরিচিতি পায়।’
‘নামের উৎপত্তি ঝগড়া থেকে হলেও বাস্তবে বাজারটি শান্তিপূর্ণ এবং বাণিজ্যনির্ভর জনপদ হিসেবে পরিচিত। আর যেহেতু বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন এখানে ব্যবসা করতে আসে এবং আশপাশের উপজেলা ও গ্রাম থেকেও মানুষজন কেনাকাটা করতে আসে তাই শান্তি-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে পুলিশ ফাঁড়ি দেওয়া প্রয়োজন’, যোগ করেন তিনি।
ভেলুয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন জানালেন ঝগড়ারচরের গুরুত্ব ও নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথা।
‘এই বাজার শুধু শেরপুর নয়, আশপাশের জেলার মানুষের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসদে শেরপুর-৩ আসনের এমপি মো. মাহমুদুল হক রুবেলের এই সুন্দর চিন্তাভাবনা আমাদের ঐতিহ্যবাহী ঝগড়ারচর বাজারের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য খুবই প্রয়োজনীয় ... পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের মাধ্যমে বাজারের আইনশৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হবে এবং ব্যবসায়ীরা নিরাপদ পরিবেশে ব্যবসা করতে পারবেন।’
তবে নাম ঝগড়ারচর হলেও বাজারে বেশ জমে আড্ডা। আশপাশের সব গ্রামের মধ্যে কেবল এখানেই পাওয়া যায় মহিষের দুধের সবচেয়ে সুস্বাদু দই ও শীতকালের ঐতিহ্যবাহী গাবা বা পিঠালি তরকারি। এ নিয়ে বেশ গর্ব গ্রামবাসীর। সংসদে তাদের গ্রামের নাম আলোচিত হওয়ায় গর্ব বেড়ে দ্বিগুণ। এখন কেবল প্রত্যাশা, তাদের নিরাপত্তার দাবি হবে পূরণ।






