গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসা
টাকার প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ওএমআর বদল!

দাখিল পরীক্ষায় সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও জীববিজ্ঞানে ফেল করেন রংপুরের গঙ্গাচড়ার এক শিক্ষার্থী। ফল পুনর্নিরীক্ষণের পরও পরিবর্তন না হওয়ায় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করেন তিনি। পরে তদন্তে তার বহুনির্বাচনী পরীক্ষার ওএমআর শিটের স্বাক্ষর ও সিরিয়াল নম্বরে গরমিল পাওয়ার কথা জানায় তদন্ত কমিটি। এ ঘটনায় চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
গত ১৭ সেপ্টেম্বর গঙ্গাচড়া মডেল থানায় মামলাটি করেন বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক মো. মোশারফ হুসেন।
মামলায় গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ ও দাখিল পরীক্ষার সহকারী কেন্দ্র সচিব আব্দুল বাকী ওরফে লিটন, সাউদপাড়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও হল সুপার রোকনুজ্জামান, গঙ্গাচড়া সিনিয়র আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব অলিউল্লাহ এবং ধনতোলা বাজার দাখিল মাদ্রাসার সুপার ইব্রাহিম খলিলকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের দাখিল পরীক্ষায় কোলকোন্দ তাকিয়া শরীফ আলিম মাদ্রাসার শিক্ষার্থী হাবিবুল বাশার মুবিন গঙ্গাচড়া ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্র থেকে জীববিজ্ঞান বিষয়ে পরীক্ষা দেন। গত ২০ মে পরীক্ষা চলাকালে পরীক্ষার্থীদের টাকার বিনিময়ে বহুনির্বাচনী প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মুবিন টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রথম আসামি আব্দুল বাকী ওরফে লিটনের সঙ্গে তার বাক্বিতণ্ডা হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, পরীক্ষা শেষে মুবিনের বহুনির্বাচনী অংশের ওএমআর শিট পরিবর্তন করে অন্য একটি ওএমআর শিট বোর্ডে পাঠানো হয়।
গত ১০ আগস্ট দাখিল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মুবিন দেখতে পান, অন্য সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও জীববিজ্ঞানে তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। ফল পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেও পরিবর্তন না হওয়ায় ১৩ সেপ্টেম্বর তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগ পাওয়ার পর বোর্ডের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মুবিনের জীববিজ্ঞান বিষয়ের লিখিত উত্তরপত্র ও বহুনির্বাচনী অংশের ওএমআর শিট পর্যালোচনা করা হয়। তখন মুবিন দাবি করেন, বোর্ডে থাকা ওএমআর শিটটি তার নয়। এরপর বোর্ডের রেজিস্ট্রারের অফিস আদেশে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পরীক্ষার্থীর আবেদন, লিখিত ও বহুনির্বাচনী পরীক্ষার ওএমআর শিট, হাজিরা শিটসহ সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে।
তদন্তে ওএমআর শিটের স্বাক্ষর ও সিরিয়াল নম্বরে গরমিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে মামলার এজাহারে। এতে বলা হয়, মুবিনের হাজিরা শিটে থাকা ওএমআর শিটের স্বাক্ষরের সঙ্গে বোর্ডে জমা দেওয়া ওএমআর শিটের স্বাক্ষরের মিল পাওয়া যায়নি। হাজিরা শিটে থাকা বহুনির্বাচনী ওএমআর শিটের সিরিয়াল নম্বর ছিল ২৫০০৫৮৬০২০। আর বোর্ডে জমা দেওয়া ওএমআর শিটের সিরিয়াল নম্বর ২৫০১৫৭৫১৫৩।
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, ২০ মে দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে গঙ্গাচড়া ডিগ্রি কলেজের পুরোনো ভবনের দ্বিতীয় তলার পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণকক্ষে ঘটনাটি ঘটে। তদন্ত কমিটির কাছে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ আসামি লিখিত বক্তব্য দিলেও প্রথম আসামি আব্দুল বাকী ওরফে লিটন বোর্ডে উপস্থিত হয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেননি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে মামলায় বলা হয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে উত্তর সরবরাহের চেষ্টা করা হয়। পরে পরীক্ষার্থীর প্রকৃত ওএমআর শিটের পরিবর্তে অন্য একটি ওএমআর শিট বোর্ডে জমা দেওয়া হয়।
মামলার দুই নম্বর আসামি সাউদপাড়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ও হল সুপার মো. রোকনুজ্জামান বলেন, ‘হঠাৎ বোর্ড থেকে ফোন করে জানানো হয়, ওএমআর পরিবর্তন হয়েছে। আমি বলি, এ বিষয়ে তো আমি কিছু জানি না। এরপর আমাদের বোর্ডে ডাকা হয়। আমরা গিয়ে বিষয়টি দেখি।’
মামলায় তাকে আসামি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি হল সুপার ছিলাম, এ জন্যই আমাকে আসামি করা হয়েছে।’
বাকি তিন আসামির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থী হাবিবুল বাশার মুবিন বলেন, ‘পরীক্ষার দিন পরীক্ষা শেষে তাদের সবাইকে থাকতে বলা হয়। এরপর তাদের কাছে টাকা চাওয়া হয়। আমি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে লিটন হুজুর আমার ওপর ক্ষুব্ধ হন।’
মুবিন বলেন, ‘ফল প্রকাশের পর দেখি, সব বিষয়ে এ প্লাস পেলেও শুধু জীববিজ্ঞানে ফেল করেছি। পরে বোর্ডে চ্যালেঞ্জ করেও ফল পরিবর্তন হয়নি। এরপর বোর্ডে গিয়ে চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিই। অভিযোগের পর খাতাগুলো বের করে দেখি, আমার ওএমআর শিট পাল্টে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বোর্ড আমাকে আশ্বস্ত করেছে, আমি সঠিক বিচার পাব এবং ভর্তির বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে। আমি চাই, এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের সবাইকে শাস্তির আওতায় আনা হোক। ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিক্ষার্থীর এমন ক্ষতি না হয়।’
মামলার বাদী বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক মো. মোশারফ হুসেন বলেন, ‘বোর্ডের লিখিত আদেশের কারণে থানায় মামলা করেছি। বোর্ডে পাঠানো কাগজপত্র দেখে মনে হয়েছে, শিক্ষার্থীর সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। তদন্তে যা পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘মামলা হয়েছে। এখন তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।’
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গঙ্গাচড়া থানার উপ-পরিদর্শক মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘মামলার পর থেকে আসামিরা গা ঢাকা দিয়েছেন। মামলাটি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
গঙ্গাচড়া মডেল থানার ওসি আব্দুস ছবুর বলেন, ‘গত ১৭ সেপ্টেম্বর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ-পরিদর্শক বাদী হয়ে মামলা করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’
ওসি বলেন, ‘প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা গেলে এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে।’




