তেঁতুলিয়ার মেঘমুক্ত আকাশে ধরা দিল কাঞ্চনজঙ্ঘা

তেঁতুলিয়ায় আবারও দেখা মিলেছে কাঞ্চনজঙ্ঘার। ছবি: আগামীর সময়
শীতের আগমনী বার্তায় পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে দেশের সর্বউত্তরের উপজেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হিমালয়কন্যাখ্যাত এই জনপদে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। তাদের প্রধান আকর্ষণ হিমালয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘা।
কয়েক দিন মেঘ ও কুয়াশার আড়ালে থাকার পর আজ মঙ্গলবার সকালে আবারও দেখা মিলেছে বরফে ঢাকা এই পর্বতশৃঙ্গের।
ভোরের মেঘমুক্ত আকাশে সূর্যের আলো ফুটতেই দূর দিগন্তে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে কাঞ্চনজঙ্ঘার মনোমুগ্ধকর অবয়ব। এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভোর থেকেই তেঁতুলিয়ার ডাকবাংলো টিলা, পিকনিক কর্নার ও মহানন্দা নদীর তীরসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভিড় করেন পর্যটকরা। সকাল ৬টা থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানেই পর্বতশৃঙ্গটি দেখা যেতে শুরু করে। তবে সবচেয়ে পরিষ্কার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো পিকনিক কর্নারের পাশের মহানন্দা নদীর তীর থেকে।
কেউ মোবাইল ফোন ও ক্যামেরায় ধারণ করছেন বরফে ঢাকা পাহাড়ের ছবি, আবার কেউ নীরবে উপভোগ করছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার এক ঝলক দেখতে অনেক পর্যটক ভোরের আগেই ছুটে আসছেন এসব দর্শনীয় স্থানে।
ঠাকুরগাঁও থেকে বন্ধুদের সঙ্গে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসেছেন পর্যটক মেহেদী হাসান মামুন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা বন্ধুরা মিলে এখানে এসেছি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা। আলহামদুলিল্লাহ, আকাশ পরিষ্কার থাকায় কাঙ্ক্ষিত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেয়েছি। আমরা অনেক খুশি।’
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক আখলেস সালেক বললেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে এসে অনেক পর্যটক হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন বলে শুনেছেন। ভোরের দিকে তারাও হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। প্রথমে কিছুটা দেখা গেলেও পরে মেঘ ও কুয়াশায় ঢেকে যায় পর্বতশৃঙ্গটি। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবারও এর সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পান তারা।
কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার পাশাপাশি পর্যটকরা ঘুরে দেখছেন মহানন্দা নদীর তীর, বিস্তীর্ণ চা বাগান ও সীমান্তঘেঁষা বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় তেঁতুলিয়ার সড়কগুলোতে বাস, মাইক্রোবাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের চলাচল বেড়েছে।
পর্যটকের চাপ বাড়ায় স্থানীয় হোটেল ও রিসোর্টগুলোর অধিকাংশ কক্ষ প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। কাঙ্ক্ষিত আবাসন না পেয়ে অনেক পর্যটক খোলা আকাশের নিচে তাঁবু টাঙিয়ে রাত কাটাচ্ছেন। রাতে আড্ডা, গান ও আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠছে পর্যটনকেন্দ্রগুলো। দিনের বেলায় কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্রতা পর্যটকদের মুগ্ধ করছে, আর রাতে তেঁতুলিয়া থেকে দূরের ভারতের পাহাড়ি জনপদ দার্জিলিংয়ের আলোর ঝলকানি তৈরি করছে ভিন্ন এক নৈসর্গিক আবহ।
তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্র নাথ রায় জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সুযোগ থাকে। আকাশ পরিষ্কার থাকায় আজ মঙ্গলবার পর্বতশৃঙ্গটির সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে। তবে পর্যটকদের ভ্রমণের আগে আকাশের অবস্থা খেয়াল করে আসার পরামর্শ দিয়েছেন।
এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশ পঞ্চগড় জোনের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুল আজিজ ইসলাম জানিয়েছেন, গত দুই দিন ধরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে আসা পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিচ্ছে। ভ্রমণের সময় কোনো সমস্যায় পড়লে পর্যটকেরা ট্যুরিস্ট পুলিশের সহায়তা নিতে পারবেন।
হিমালয়ের হাতছানি, কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্রতা, চা বাগানের সবুজ আর মহানন্দা নদীর সৌন্দর্য মিলিয়ে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে তেঁতুলিয়া। দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের পদচারণায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরেছে উত্তরের এই সীমান্ত জনপদে।
হিমালয়ের পূর্বাংশে নেপাল ও ভারতের সিকিম সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা ৮ হাজার ৫৮৬ মিটার বা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট। এভারেস্ট ও কে-টু-এর পর এটি বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ। বাংলাদেশ থেকে বরফে ঢাকা এই পর্বতের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার অন্যতম পরিচিত স্থান পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া।




