ভবন অবকাঠামো থাকলেও পূর্ণাঙ্গ সেবা মিলছে না কাপাসিয়ার ৩ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে

তারাগঞ্জ মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র
ভবন আছে, ১০টি শয্যা আছে, আছে অস্ত্রোপচার কক্ষসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। কিন্তু নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও জনবল। ফলে বছরের পর বছর ধরে সীমিত সক্ষমতায় চলছে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার তিনটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র।
কোথাও চিকিৎসকের পদ শূন্য, কোথাও রয়েছে ওষুধ ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের সংকট। জনবল না থাকায় অস্ত্রোপচার কক্ষসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোরও পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হচ্ছে না। এতে প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী নারী ও শিশুরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের পাবুর, দুর্গাপুর ইউনিয়নের তারাগঞ্জ এবং রায়েদ ইউনিয়নের দরদরিয়া গ্রামে এসব মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রত্যন্ত এলাকার গর্ভবতী নারী ও শিশুদের হাতের নাগালে প্রসূতি ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়াই ছিল এসব কেন্দ্র স্থাপনের উদ্দেশ্য। তবে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় দীর্ঘদিনেও সেই লক্ষ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি কেন্দ্রে মেডিকেল অফিসারের দুটি পদ, একজন ফার্মাসিস্ট, একজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব), একজন অফিস সহকারী, একজন অফিস সহায়ক এবং চারজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাসহ বিভিন্ন পদ রয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এসব পদের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
প্রতিটি কেন্দ্রে ১০টি শয্যা, ওয়ার্ড, কেবিন, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ডরমেটরি, বিদ্যুৎ সংযোগ ও বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য জেনারেটর রয়েছে। অস্ত্রোপচার কক্ষও আছে। তবে চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব অবকাঠামো ও সরঞ্জামের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হচ্ছে না।
রায়েদ ইউনিয়নের দরদরিয়া গ্রামের সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করা হয় ২০১৭ সালের ২ ফেব্রুয়ারি।
উদ্বোধনের পর স্থানীয়দের মধ্যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, গর্ভবতী নারী ও শিশুদের চিকিৎসার জন্য আর দূরের হাসপাতালে যেতে হবে না। কিন্তু প্রায় ৯ বছর পরও কেন্দ্রটিতে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবলের সংকটে সীমিত পরিসরেই চলছে কার্যক্রম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, চিকিৎসক না থাকায় অনেক রোগী কেন্দ্রে এসে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যান। আবার ওষুধের সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এতে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।
পাবুর গ্রামের আব্দুল বাতেন বলেন, ‘ডাক্তার-নার্স না থাকায় এলাকার মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’
পাবুর হাসপাতালসংলগ্ন ব্যবসায়ী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘হাসপাতাল চালু হওয়ার পর থেকে কোনো ডাক্তার-নার্স দেখি নাই। আমরা চিকিৎসাসেবা পাই না।’
দেওনা গ্রামের ফরিদা খাতুন বলেন, ‘আগে গেলে ওষুধ দিত, এখন আর দেয় না। ওষুধ থাকলেও ডাক্তার নাই। গেলেই কাপাসিয়া হাসপাতালে পাঠায়।’
দরদরিয়া গ্রামের জিনু মিয়া বললেন, ‘জ্বর-ঠান্ডা হলে আগে এখানে ওষুধ নিতাম। এখন গেলে কিছুই পাওয়া যায় না।’
সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রটিতে চিকিৎসাসেবার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রয়েছে। শয্যা, ওয়ার্ড, কেবিন ও অস্ত্রোপচার কক্ষসহ বিভিন্ন সুবিধা থাকলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার হচ্ছে না। মূল সংকট চিকিৎসক ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি।
পাবুর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের একজন ফার্মাসিস্ট বলেন, ‘রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসক না থাকায় আমাকেই প্রাথমিক চিকিৎসা ও ওষুধ দিতে হয়। গুরুতর রোগীদের উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হয়।’
কাপাসিয়ার তিনটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করেছেন গাজীপুর জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু তাহের মো. সানাউল্লাহ নূরী।
তিনি বলেন, ‘কাপাসিয়ায় তিনটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রে ৫০ শতাংশের বেশি পদই শূন্য। কাপাসিয়া উপজেলায় মেডিকেল অফিসারদের সব পদই শূন্য। বিষয়গুলো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।’
কাপাসিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোসা. রহিমা খাতুন জানান, উপজেলার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে চারজন মেডিকেল অফিসারের পদ শূন্য রয়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা দিতে জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে ওষুধের সংকট থাকায় চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এতে সেবাগ্রহীতাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ওষুধ দিতে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘জনবল সংকট ও ওষুধ সরবরাহের বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। তবে এখনো সমস্যাগুলোর পুরোপুরি সমাধান হয়নি। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।’



