রামপালে গোলপাতার ঘরে স্বাস্থ্যসেবা, মানুষের দোরগোড়ায় ‘সেবাবন্ধু’

সুন্দরবনের গোলপাতা দিয়ে তৈরি গোলঘরে বসেই বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরামর্শ পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ছবি: আগামীর সময়
উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের রামপালে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চালু হয়েছে ‘সেবাবন্ধু’ কার্যক্রম। সুন্দরবনের গোলপাতা দিয়ে তৈরি গোলঘরে বসেই বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরামর্শ পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা, রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার আওতায় আনাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
‘আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর উদ্যোগে পরিচালিত এ কার্যক্রমের আওতায় রামপাল উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে প্রাথমিকভাবে ১০টি গোলপাতার ঘর তৈরি করা হয়েছে। এসব ঘরে দায়িত্ব পালন করছেন সেবাবন্ধুরা। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের নাম, বয়স, রোগের ইতিহাস ও পারিবারিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করছেন। পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
সম্প্রতি উপজেলার ঝনঝনিয়া এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম ঘুরে দেখা যায়, প্রতি শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়। সেখানে রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ওজন পরিমাপসহ বিভিন্ন প্রাথমিক পরীক্ষা করা হচ্ছে। কারও শারীরিক অবস্থায় জটিলতার আশঙ্কা দেখা দিলে তাকে ‘আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে’ পাঠানো হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরবর্তী চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে বিদেশি চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব ইলেকট্রনিক মেডিকেল রেকর্ড (ইএমআর) ব্যবস্থায় রোগীদের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। এতে আগের চিকিৎসার তথ্য পর্যালোচনা করে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা সহজ হয়।
সেবাবন্ধু কেন্দ্রে আসা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের মতো রোগে ভুগলেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন না। কেউ কেউ মাথা ঘোরা কিংবা শারীরিক দুর্বলতাকে স্বাভাবিক সমস্যা মনে করে এড়িয়ে গেছেন। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, অসচেতনতা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে যাতায়াতের অসুবিধাও নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রামপালের রাজনগর ইউনিয়নের চকগোনা গ্রামের তাপস বিশাল (৬০) বললেন, ‘আগে নিয়মিত রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস পরীক্ষা করাতাম না। মাঝেমধ্যে মাথা ঘুরত, শরীর দুর্বল লাগত। ভাবতাম, স্বাভাবিক দুর্বলতা। চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর জানতে পারি, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস বেড়ে গেছে। এখন গ্রামের কাছেই সেবাবন্ধু কেন্দ্রে বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারছি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খাওয়া ও নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করছি। এতে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হতে পেরেছি।’
বাইনতলা ইউনিয়নের সগুনা গ্রামের কনিকা রাণী পাল (৬৫) বলেছেন, ‘আগে শরীর খারাপ না লাগলে চিকিৎসকের কাছে যেতাম না। নিয়মিত পরীক্ষা করানোর সুযোগও ছিল না। এখন সেবাবন্ধু কেন্দ্রে এসে রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে পারছি। কোনো সমস্যা ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ পাচ্ছি। এতে রোগ সম্পর্কে আগে থেকেই জানা যাচ্ছে এবং কীভাবে চলাফেরা করতে হবে, সে বিষয়েও ধারণা পাচ্ছি। আমাদের মতো গ্রামের মানুষের জন্য এ ধরনের সেবা খুবই উপকারী।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাড়ির কাছাকাছি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও পরামর্শের সুযোগ তৈরি হওয়ায় রোগ সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং নিয়মিত চিকিৎসা নেওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো মানুষ প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেদের শারীরিক অবস্থা জানার সুযোগ পাচ্ছেন।
‘আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রেজা সেলিম বললেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। মানুষ অসুস্থ হলে অনেক সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। শরীরে কোনো গুটি বা টিউমার দেখা দিলেই অনেকে সেটিকে ক্যানসার মনে করেন। অথচ সব টিউমার ক্যানসার নয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সঠিক পরামর্শ ও পরীক্ষা জরুরি।’
‘আমরা প্রায় ২০ বছর ধরে স্তন ক্যানসার নিয়ে কাজ করছি। আমাদের উদ্দেশ্য শুধু অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়া নয় বরং মানুষ যেন রোগের ঝুঁকি সম্পর্কে আগে থেকেই সচেতন হয়, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করায় এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ মেনে চলে, সেই অভ্যাস গড়ে তোলা। এ জন্যই সেবাবন্ধু কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে,’ যোগ করলেন তিনি।
তিনি জানিয়েছেন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সচেতনতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ বাড়ে এবং জটিলতা কমানোর চেষ্টা করা যায়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম মন্তব্য করেন, ‘গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের’ কার্যক্রম দেখে আমি অভিভূত। প্রান্তিক মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তারা যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসনীয়। এখানে অভিজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অনলাইনে বিদেশি চিকিৎসকদের পরামর্শ নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার এই প্রচেষ্টা দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুকরণীয় হতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সেবাবন্ধু কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রোগের ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও সচেতনতা তৈরির সুযোগ বাড়ছে। নিয়মিত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগের ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষকে চিকিৎসার আওতায় আনতে উদ্যোগটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




