‘প্রয়াস’ থেকে পালিয়েছেন ৪০ রোগী, মৃত্যুর ঘটনায় নেই মামলা

ছবি: আগামীর সময়
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ফোরকান (২৯) নামে এক রোগীর মৃত্যুর পর সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া ৪০ রোগীর বিষয়ে এখনো পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
এমনকি পালিয়ে যাওয়া রোগীদের কোনো খোঁজ-খবরও জানে না নিরাময়কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, ফোরকানকে মারধর ও নির্যাতনের পর বিনা চিকিৎসায় ফেলে রাখার অভিযোগ করেছেন পালিয়ে আসা কয়েকজন রোগী। তবে মৃত্যুর ঘটনায় এখনো নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে করা হয়েছে অপমৃত্যুর মামলা।
গত মঙ্গলবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ‘প্রয়াস’ মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে ফোরকান নামের ওই রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর বুধবার দুপুরে চিকিৎসাধীন ৪০ রোগী কেন্দ্রটি থেকে পালিয়ে যান। পরে স্থানীয় লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালালে কেন্দ্রটির পরিচালকরা পালিয়ে যান। বর্তমানে নিরাময়কেন্দ্রটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
পালিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনজন অভিযোগ করেন, তারা ভয়ে কেন্দ্র থেকে পালিয়ে এসেছেন। তাদের ভাষ্য, ফোরকানকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় এবং নির্যাতনের পর মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। পরে তাকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। তাদের চোখের সামনেই ফোরকানের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তারা।
পালিয়ে আসা এক রোগী বলেন, ‘আমরা সবাই ভয়ে পালিয়ে এসেছি। না পালালে আমাদেরও নির্যাতন ও মারধরের শিকার হতে হতো। ফোরকানের সঙ্গে যা হয়েছে, তা আমাদের চোখের সামনেই হয়েছে। আমরা তার হত্যার বিচার চাই।’
আরেক রোগী অভিযোগ করেন, নিরাময়কেন্দ্রে কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, নার্স, বয় বা আয়া নেই। রোগীদের দিয়েই পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হতো। পালিয়ে যাওয়ার আগে তাদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তারা।
নবীনগর উপজেলার সলিমগঞ্জের সামজিদ রহমানও ওই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফোরকানের মৃত্যুর পর তিনিও পালিয়ে যান। সামজিদের ভাষ্য, ফোরকানকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে নির্যাতন ও মারধর করা হয়। পরে তাকে মেঝেতে ফেলে রাখা হলেও কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তিনি মারা যান।
‘প্রয়াস’র পরিচালক প্রমোদ বর্মণ বলেন, মাদক নিরাময়কেন্দ্রটির মূল মালিক ইকরামুল হক রুবেল। রোগীদের পালিয়ে যাওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা কেউই এখন নিরাময়কেন্দ্রে নেই। স্থানীয়রা ভাঙচুর চালালে পরিচালকরা সরে আসেন। পালিয়ে যাওয়া রোগীদের তথ্য আমাদের কাছে নেই।’
তবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার ওসি মো. শহীদুল ইসলাম বললেন, নিরাময়কেন্দ্রে তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা অভিযোগ দেওয়া হয়নি। চিকিৎসাধীন রোগীরা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নিরাময়কেন্দ্রের পক্ষ থেকেও থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
নিহত ফোরকানের ভগ্নিপতি ইমন হোসেন অভিযোগ করেন, পালিয়ে যাওয়া কয়েকজন রোগীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে। তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তার দাবি, ফোরকানকে নির্যাতন ও মারধর করে কোনো চিকিৎসা না দিয়েই হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতে মামলা করব।’
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে রোগীদের বক্তব্য প্রভাবিত করার অভিযোগও তুলেছেন ইমন হোসেন। তার দাবি, ফোরকানের মৃত্যুর পরপরই অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে রোগীদের বক্তব্য নিয়েছেন এবং স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে—এমন বক্তব্য দিতে তাদের প্রভাবিত করেছেন।
অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাজেদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমরা বৃহস্পতিবারই পরিদর্শনে গিয়েছি। এর আগে সেখানে যাইনি।’
তিনি আরও বলেন, নিরাময়কেন্দ্রটির জানালা ভাঙা থাকায় সেখানে অধিদপ্তরের একজন লোক রাখা হয়েছে। জানালা মেরামতের পর কেন্দ্রটির তত্ত্বাবধানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফোরকানের মৃত্যুর পরপরই অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা সেখানে গিয়ে রোগীদের বক্তব্য রেকর্ড করেছেন—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘না, আমরা যাইনি। পালিয়ে যাওয়া রোগীরা এসব এমনিতেই বলছেন।’
তিনি আরও বলেন, নিরাময়কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ কোনো অনিয়ম বা নিয়ম লঙ্ঘন করে থাকলে তাদের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে। ফোরকানের মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশের তদন্তে বিচার হবে।
প্রয়াস মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইকরামুল হক ওরফে রুবেলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এর আগে ২০১৪ সালের ৯ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর তার লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল ‘প্রয়াস’র বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় মামলাও হয়েছিল।
ফোরকানের মৃত্যুর ঘটনায় ওঠা নির্যাতনের অভিযোগ, ৪০ রোগীর পালিয়ে যাওয়া এবং নিরাময়কেন্দ্রটির কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এখন তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে সামনে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।







