পাবনা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রেরই প্রয়োজন চিকিৎসা
- অচল অপারেশন থিয়েটার
- ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট
- বিনামূল্যের সেবায় লাগছে টাকা
- কর্তৃপক্ষ জানলেও মেলেনি সাড়া

চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে নিয়ে পাবনা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রের আঙিনায় ঘুরছিলেন সদর উপজেলার আটুয়া গ্রামের রহিমা বেগম। স্বল্প খরচে মেয়ের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে সরকারি এ কেন্দ্রে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু একটি প্রেসক্রিপশন ছাড়া মেলেনি আর কোনো সেবা। হয়নি আলট্রাসনোগ্রাফি কিংবা প্রয়োজনীয় কোনো পরীক্ষা।
রহিমা বেগম জানালেন, দুই বছর আগে মেয়ের প্রথম সন্তান প্রসবের সময়ও এই কেন্দ্রে এসে সেবা না পেয়ে তাকে যেতে হয়েছিল বেসরকারি ক্লিনিকে। সেখানে গর্ভকালীন পরীক্ষা করাতে খরচ হয় ৩-৪ হাজার টাকা। এবারও হতে হচ্ছে একই পরিস্থিতির মুখোমুখি।
শুধু রহিমা নন, তার মতো নিম্ন আয়ের বহু পরিবারের ভরসার এ সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকছে নানা সংকটে। স্থানীয়দের কাছে ‘ডেলিভারি হাসপাতাল’ নামে পরিচিত পাবনার একমাত্র বিশেষায়িত প্রসূতিসেবা কেন্দ্রটিতে চলতি বছরের শুরু থেকে বন্ধ অপারেশন থিয়েটার (ওটি)। নেই পর্যাপ্ত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। স্থায়ী জনবলও নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয় ২০ শয্যার এ কেন্দ্রটি। শুরুতে প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে ভবনটিও। সর্বশেষ ভবনটি মেরামত করা হয়েছিল ১৯৯২ সালে। ভারী বৃষ্টিতে ওয়ার্ডে জমে যায় পানি।
এদিকে কেন্দ্রটিতে অনুমোদিত স্থায়ী পদের সংখ্যা সাতটি। এর মধ্যে প্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নিরাপত্তাকর্মীর পদ তিনটি। বাকি চারটি পদে রয়েছেন মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক), ফিমেল মেডিকেল অ্যাটেনডেন্ট, পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও সহকারী নার্সিং অ্যাটেনডেন্ট। তবে বর্তমানে এসব পদের কোনোটিতেই স্থায়ী জনবল নেই।
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছর জুলাই পর্যন্ত এখানে স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে প্রায় ৭০০টি। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৬০টির মতো প্রসব হয়েছে। গত বছরের শেষদিকে ১২টি সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হলেও এরপর থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ।
দরিভাউডাঙ্গা গ্রামের আমিনা বেগম বললেন, ‘সেবা বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রসবের প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনতে হয়। এতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ হয়।’
হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট মো. কামরুল ইসলাম বলেছেন, গত দুই বছর ধরে স্যালাইন, অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম ও ওষুধের নিয়মিত সরকারি সরবরাহ নেই। জ্বালানি বরাদ্দ না থাকায় কেন্দ্রের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সও দীর্ঘদিন ধরে অচল।
এদিকে প্রসূতিপূর্ব, প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর সেবার পাশাপাশি বহির্বিভাগের রোগীও সামলাতে হচ্ছে হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. ঊর্মি সাহাকে। তিনি বললেন, ‘এখানে দুটি সার্জিক্যাল টেবিল আছে। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়া মেশিনটি প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। কোনো অ্যানেসথেসিস্টও নেই। এ কারণে গত ছয় মাস ধরে অস্ত্রোপচার বন্ধ।’
তিনি আরও বললেন, ‘জনবল, সরঞ্জাম ও অবকাঠামোর সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপপরিচালক এ বি এম শরিফুল হক বলেছেন, ‘সারা দেশের অনেক পরিবার পরিকল্পনা হাসপাতালেরই একই অবস্থা। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগ, ওষুধ ও অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম সরবরাহ, ভবন মেরামত এবং পুরনো যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপনের জন্য নিয়মিত চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে এখনো কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি।’
সরকারি এ চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রসূতি সেবার ওপর নিম্ন আয়ের মানুষের নির্ভরতা থাকলেও দীর্ঘদিনের সংকট কাটছে না। ফলে জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলে রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক বা অন্য হাসপাতালে। এতে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় আর সংকটে পড়ছে দরিদ্র পরিবারগুলো।






