জামা কিনে ঈদ করতে যাচ্ছিলেন নাবিল, নানা পেলেন লাশ

নাবিলের নানা পিয়ার আলী
‘নানা, আমি আর ১৫ মিনিটের মধ্যে খোকসা বাসস্ট্যান্ডে চলে আসতেছি’... মোবাইলে নানাকে বলা এটাই ছিল নাতি নাবিলের শেষ কথা। এর ঠিক ১ ঘণ্টা পর নানা পিয়ার আলী যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালেন, ততক্ষণে সব শেষ। নাতি এসেছে, তবে হেঁটে নয়, লাশ হয়ে। হাসপাতালের করিডোরে নাতির নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ পিয়ার আলী। তার কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছিল হাসপাতালের বাতাস।
শনিবার (২৩ মে) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়ার খোকসায় ট্রাকের ধাক্কায় একটি যাত্রীবাহী বাস পুকুরে পড়ে ঘটে এ দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারান ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলসহ চারজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন।
নিহত নাবিলের নানার পরিবার জানিয়েছে, নাবিলের বাড়ি ফরিদপুর সদর উপজেলায়। তার বাবা ছোটখাটো ব্যবসা করেন। মা অনেক কষ্ট করে ছেলেকে রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি করেছিলেন। মায়ের স্বপ্ন ছিল- ছেলে পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি করবে, সংসারের হাল ধরবে। কিন্তু একটি বেপরোয়া ড্রাম ট্রাকের ধাক্কা মুহূর্তে ওলটপালট করে দিল সব স্বপ্ন।
‘ওদের এবার কোরবানি ছিল না। তাই আমি বললাম তুমি এখানে চলে আসো। ও ঈদ করতে আমার বাড়িতে আসছিল। আমি ওকে শুক্রবার আসতে বলেছিলাম, কিন্তু ও বলল জামাকাপড় কিনে শনিবার আসবে। সকাল সাড়ে ৮টায় ফোন করলাম, বলল রওনা হয়েছে। সাড়ে ৯টায় বলল আর ১৫ মিনিট লাগবে। সাড়ে ১০টার পর থেকে ফোন বন্ধ। ভেবেছিলাম চার্জ নেই, কিন্তু মন মানছিল না। বাসস্ট্যান্ডে এসে শুনি গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। হাসপাতালে এসে দেখি ও মরে পড়ে আছে’ বলেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠলেন নাবিলের নানা পিয়ার আলী।
পুলিশ জানায়, রাজবাড়ী থেকে কুষ্টিয়াগামী একটি যাত্রীবাহী বাসকে বিপরীত দিক থেকে আসা দ্রুতগামী ড্রাম ট্রাক সজোরে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার তীব্রতায় বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের একটি পুকুরে উল্টে পড়ে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় জনতা ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। বাস থেকে যাত্রীদের উদ্ধার করে খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাবিলসহ দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত অন্যজনের বয়স আনুমানিক ৬০ বছর, যার পরিচয় এখনও জানা যায়নি। পরে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও দুজনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একজন কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ফিলিপনগর এলাকার রফিয়া (১৭) এবং অন্যজন আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি। এ নিয়ে দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ জনে।
খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, আহতদের মধ্যে ১১ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, যার মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকিরা খোকসায় চিকিৎসাধীন।
কুষ্টিয়া হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু ওবায়েদ দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, বিপরীত দিক থেকে আসা ড্রাম ট্রাকের ধাক্কাতেই বাসটি ডোবায় উল্টে যায়।
খোকসা সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানিয়েছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।







