স্বস্তির ঠিকানায় বিষাক্ত বাতাস
- রাজশাহীর ১৫ বিনোদনকেন্দ্রেই কমবেশি দূষণ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নির্মল বাতাসের আশায় মানুষ যায় পার্কে। গাছের ছায়ায় বসে স্বস্তি খোঁজে। নদীর পাড়ে কাটায় অবসর। শিশুদের নিয়ে পরিবার যায় বিনোদনকেন্দ্রে। নগরের কোলাহল থেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য দূরে থাকতে চায় মানুষ। কিন্তু সেই জায়গাগুলোর বাতাসও যদি দূষিত হয়, তবে মানুষ আর যাবে কোথায়?
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চিত্র। তাও আবার পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর বিনোদনকেন্দ্রে। রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুমাইয়া তাবাসসুমের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটির বিষয় ছিল ‘রাজশাহী শহরের বিনোদনকেন্দ্রগুলোর বায়ুর মান এবং মানদণ্ডের মাত্রা ছাড়ানো কণাদূষণ ও গ্যাসীয় দূষণের পর্যালোচনা’।
২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে রাজশাহী শহরের ১৫টি জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘স্প্রিঙ্গার’-এর একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে গত মাসে প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, সব কয়টি স্থানেই আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণার ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি স্থানের বাতাসকে চিহ্নিত করা হয়েছে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে।
গবেষণায় এই ১৫টি জনপ্রিয় বিনোদনকেন্দ্রের বায়ুর মান পর্যালোচনা করা হয়। এসব স্থানে বিভিন্ন ধরনের কণা ও গ্যাসীয় দূষকের মাত্রা পরিমাপ করেন গবেষকরা। একই সঙ্গে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্যও সংগ্রহ করা হয়। গবেষকরা আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণা, ১০ মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের কণা এবং এক মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের অতি সূক্ষ্ম কণার মাত্রা পরিমাপ করেন। পাশাপাশি ফরমালডিহাইড (একধরনের বর্ণহীন ও তীব্র গন্ধযুক্ত রাসায়নিক যৌগ) ও মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগের উপস্থিতিও পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফল ছিল উদ্বেগজনক। ১৫টি বিনোদনকেন্দ্রের একটিতেও আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার মধ্যে ছিল না।
গবেষণায় ছয়টি স্থানকে অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো— পদ্মা গার্ডেন, জিয়া পার্ক, শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, মুক্তমঞ্চ, সর্মংলা ইকো পার্ক ও সাফিনা পার্ক। ১৫টি স্থানের বায়ুমান সূচক ছিল ১৩ থেকে ১৭৭-এর মধ্যে। সব স্থান মিলিয়ে আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণার গড় ঘনত্ব পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ৪৯ দশমিক ২৪ মাইক্রোগ্রাম। ১০ মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের কণার গড় ঘনত্ব ছিল ৬১ দশমিক ১১ মাইক্রোগ্রাম। এক মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের অতি সূক্ষ্ম কণার গড় ঘনত্ব ছিল ৩৩ দশমিক ২২ মাইক্রোগ্রাম।
সবচেয়ে বেশি কণাদূষণ পাওয়া গেছে পদ্মা গার্ডেনে। সেখানে আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণার ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০৫ মাইক্রোগ্রাম। ১০ মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের কণার ঘনত্ব ছিল ১৩৫ মাইক্রোগ্রাম। এক মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের অতি সূক্ষ্ম কণার ঘনত্ব ছিল ৭০ মাইক্রোগ্রাম।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম মাত্রা পাওয়া গেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমিতে। সেখানে একই তিন ধরনের কণার ঘনত্ব ছিল যথাক্রমে ১১, ১৪ ও ৬ মাইক্রোগ্রাম। শুধু স্থানভেদে নয়, সময়ের সঙ্গেও বদলেছে দূষণের মাত্রা। গবেষকরা বিকাল ৪টা, ৫টা ও ৬টায় এসব স্থানের বাতাস পরিমাপ করেন। দেখা যায়, বেশিরভাগ স্থানেই বিকাল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণা ও এক মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের অতি সূক্ষ্ম কণার মাত্রা বেড়েছে। এ সময়েই সাধারণত বিনোদনকেন্দ্রগুলোয় মানুষের ভিড় বাড়ে। বাড়ে যানবাহনের চলাচলও। গবেষকরা মানুষের চলাচল ও যানবাহনের চাপের সঙ্গে দূষণের এই বৃদ্ধির সম্পর্ক পেয়েছেন। খাবারের দোকান ও বিনোদনকেন্দ্রের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডও দূষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়। তবে দূষণের উৎস শুধু বিনোদনকেন্দ্রের ভেতরে নয়। আশপাশের এলাকা থেকেও বাতাসের সঙ্গে সূক্ষ্ম কণা এসব স্থানে এসে জমা হতে পারে। গবেষণার প্রধান গবেষক সুমাইয়া তাবাসসুম বলেছেন, ‘গবেষকরা বিভিন্ন স্থানে দূষণের সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করেছেন। এসব উৎসের প্রভাব আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বললেন, ‘গবেষণায় আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণা, ১০ মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের কণা এবং এক মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের অতি সূক্ষ্ম কণার মধ্যে শক্তিশালী পারস্পরিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, এসব কণাদূষণের উৎস অনেক ক্ষেত্রে একই। তবে ফরমালডিহাইড ও মোট উদ্বায়ী জৈব যৌগের ক্ষেত্রে দূষণের ধরন ছিল ভিন্ন। অর্থাৎ, সব দূষক একই উৎস থেকে আসছে না। স্থানভেদে দূষণের উৎস ও ধরনও বদলে যাচ্ছে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘বিনোদনকেন্দ্রের ভেতরের দূষণকে শুধু সেখানকার কর্মকাণ্ড দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। আড়াই মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের সূক্ষ্ম কণা এবং ১০ মাইক্রোমিটারের কম ব্যাসের কণা আশপাশের এলাকা থেকে পরিবাহিত হয়ে নির্দিষ্ট স্থানে জমা হতে পারে। এটি বাতাসের গতিপথ ও মৌসুমি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘রাজশাহীর সামগ্রিক বায়ুদূষণের পেছনে অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, যানবাহন ও শিল্পকারখানার নির্গমন এবং সবুজ এলাকা ও জলাধার কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজশাহীতে দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। সড়ক, উড়ালসড়ক ও ভবন নির্মাণের মতো কর্মকাণ্ড থেকে বিপুল পরিমাণ ধুলা এবং সূক্ষ্ম কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।’






