সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ কয়রায়, তবু নেই পর্যটনের মানচিত্রে

ছবি: আগামীর সময়
ছোট্ট একটা গ্রাম। নাম তার তেঁতুলতলার চর। তিন পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কয়রা নদী। নদীর প্রস্থও বেশি নয়; মাত্র ১০০ মিটার। কোনো কোনো স্থানে প্রশস্ততা আরও কম। নদীর ওপারে বিশ্ব ঐতিহ্য মনোমুগ্ধকর সুন্দরবন। গাঢ় সবুজের বিশাল বন। জনপদে কান পাতলেই শোনা যায় হরেক পাখির কোলাহল, পশুর ডাক, কখনো আবার বাঘের গর্জন। রাস্তায় বের হলে দেখা মেলে বানর, হরিণসহ নানা প্রজাতির বন্য প্রাণী।
সুন্দরবনকে কাছ থেকে উপভোগ করার অন্যতম স্থান। তেঁতুলতলা গ্রামের দৃশ্যই যেন একটি সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রের প্রস্তুত মঞ্চ। খুলনার কয়রা উপজেলার সুন্দরবনঘেঁষা মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে তেঁতুলতলার চর।
শাকবাড়িয়া নদীর এক পাড়ে লোকালয়, অন্য পাড়ে রোমাঞ্চকর সুন্দরবন। নদীর কিনারে দাঁড়ালেই দেখা যায় সবুজ ম্যানগ্রোভ বন। কখনো চিত্রা হরিণ, কখনো বানর; নদীতে কুমির কিংবা শুশুকের দেখা মেলার কথাও জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। সূর্যাস্তের সময় নদী, বন আর আকাশের রঙ বদলে তৈরি হয় অন্য রকম দৃশ্য। কোথাও কেওড়া-গরানের সারি, কোথাও জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকা খাল। নৌকার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সঙ্গে মিশে থাকে পাখির ডাক। ভাগ্য সহায় হলে নদীর পাড়ে দেখা মেলে চিত্রা হরিণের। সন্ধ্যা নামলে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
কয়রা উপজেলার কয়েক কিলোমিটার জুড়ে রয়েছে এমন দৃশ্য। রয়েছে উপকূলের মানুষের জীবন-জীবিকা দেখার সুযোগ; রয়েছে খানজাহান আলী (র.)-এর স্মৃতিবিজড়িত মসজিদসহ বহু প্রাচীন ঐতিহ্য। সুন্দরবনের সবচেয়ে বেশি অংশ কয়রা উপজেলার মধ্যে থাকলেও আজও গড়ে ওঠেনি কোনো পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের জন্য এখনো গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো।
এমন প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নিয়েই খুলনার কয়রা উপজেলা। সুন্দরবনের কাছাকাছি অবস্থান, নদী-খাল, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও উপকূলীয় জীবনযাত্রা—সব মিলিয়ে পর্যটনের জন্য অনন্য সম্ভাবনা রয়েছে এ জনপদে। অথচ দেশের পর্যটন মানচিত্রে কয়রার অবস্থান এখনো অনেকটা আড়ালে।
সুন্দরবনের বড় একটি অংশ কয়রার সঙ্গে যুক্ত হলেও পর্যটনকেন্দ্রিক অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি তেমন। নেই পর্যাপ্ত আবাসিক হোটেল, পরিবেশবান্ধব কটেজ কিংবা পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের বড় অংশ দিনের ভ্রমণ শেষে খুলনা শহর বা অন্য এলাকায় ফিরে যান।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পর্যটনকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া হলে শুধু সুন্দরবন দেখার সুযোগই তৈরি হবে না; স্থানীয় মানুষের জন্যও খুলে যেতে পারে আয়ের নতুন দরজা।
উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, কয়রার কয়েকটি এলাকায় লোকালয়ের কাছাকাছি থেকেই সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্য প্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করা যায়। পরিকল্পিতভাবে পর্যটনব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করেই নতুন একটি ইকো-ট্যুরিজম মডেল তৈরি করা সম্ভব। এতে অবহেলিত মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ঘটবে বলে মন্তব্য তার।
শুধু সুন্দরবন নয়; রয়েছে নানা ঐতিহ্য
কয়রার পর্যটন সম্ভাবনা সুন্দরবনেই সীমাবদ্ধ নয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে নদী, খাল, বিল, সবুজ প্রকৃতি ও উপকূলীয় জনজীবনের বৈচিত্র্য। পাশাপাশি রয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শন।
মসজিদকুঁড় মসজিদ এ অঞ্চলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক স্থাপনা। সুলতানি আমলের এ স্থাপনাকে ঘিরে স্থানীয় ইতিহাস ও জনপদের পরিচয় গড়ে উঠেছে। এর বাইরে প্রাচীন দিঘি, বিভিন্ন মাজার ও ঐতিহাসিক স্থানের সঙ্গে কয়রার অতীত জড়িয়ে আছে।
বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম নেতা রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন, প্রাচীন দিঘি, খানজাহান আলীর (র.) অনুসারীদের মাজার এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা এই অঞ্চলকে করেছে আরও সমৃদ্ধ।
কয়রার সঙ্গে পাইকগাছার রাড়ুলির ঐতিহাসিক গুরুত্বও পর্যটন রুটে যুক্ত করা যেতে পারে। উপমহাদেশের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত রাড়ুলি এ অঞ্চলের পর্যটন পরিকল্পনায় আলাদা মাত্রা যোগ করতে পারে।
অর্থাৎ প্রকৃতি, ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে একসঙ্গে রেখে একটি পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
বড় বাধা অবকাঠামো; প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ
সম্ভাবনার বিপরীতে কয়রার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অবকাঠামো। পর্যটকদের থাকার মতো মানসম্মত আবাসন নেই বললেই চলে। নেই উন্নতমানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ বা মানসম্মত রেস্টুরেন্ট। পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, নির্দিষ্ট নৌঘাট, গাইডব্যবস্থা ও বিনোদন সুবিধাও পর্যাপ্ত নয়।
অভ্যন্তরীণ কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগও এখনো পর্যটনবান্ধব নয়। নৌপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা, নৌযানের মান ও নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।
পর্যটকদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তাব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। এসব সুবিধা নিশ্চিত করে একটা পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি স্থানীয়দের।
বদলাতে পারে স্থানীয় অর্থনীতি
কয়রায় পর্যটনশিল্পের বিকাশ হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে স্থানীয় অর্থনীতিতে। পর্যটকদের ঘিরে আবাসন, খাবারের দোকান, পরিবহন, নৌযান, স্থানীয় পণ্য ও হস্তশিল্পের বাজার তৈরি হতে পারে।
তরুণদের একটি অংশ প্রশিক্ষণ নিয়ে ট্যুর গাইড, নৌযানচালক, ড্রাইভার কিংবা পর্যটনসেবা কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারেন। নারীদের জন্য তৈরি হতে পারে স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, কুটিরশিল্প ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ।
স্থানীয় কৃষক ও জেলেদের উৎপাদিত পণ্যও পর্যটন বাজারে বিক্রির সুযোগ পেতে পারে। ফলে পর্যটনের অর্থ শুধু হোটেল-মোটেলের মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো কয়রা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কয়রার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদী, বন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন। সেই জনপদে পর্যটন যদি পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে, তাহলে সুন্দরবনের সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি উপকূলের মানুষের জীবনেও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলবে।
কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিনের ভাষ্য, ম্যানগ্রোভ বনভিত্তিক ইকো-ট্যুরিজম উপকূলীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে পর্যটন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণকে অংশীদার করতে হবে এবং সুন্দরবনের পরিবেশগত ভারসাম্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
কয়রা সুন্দরবনের একটি আদর্শ ‘গেটওয়ে’ হতে পারে। নৌপথে সহজ যোগাযোগ এবং অভয়ারণ্যের নৈকট্য পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে বলে কলামিস্ট ও সাংবাদিক ফরহাদ হোসেন মন্তব্য করেন।
ট্যুরিজম বোর্ডের উদ্যোগ, বাস্তবায়ন হয়নি পাঁচ বছরেও
কয়রায় পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। একই অর্থবছরে খুলনা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত জায়গাটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ায় বন বিভাগের আপত্তিতে সেখানে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরে ট্যুরিজম বোর্ডের অনুমতি নিয়ে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করে কয়রা সদর ইউনিয়নের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামের শাকবাড়িয়া নদীর তীরের কেওড়াকাটা এলাকায় নির্ধারণ করা হয়। নতুন জায়গা পরিদর্শন ও নকশা তৈরির পরও প্রায় তিন বছর ধরে নির্মাণকাজ দৃশ্যমান হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের অনুমোদন ও অর্থ বরাদ্দের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পর্যটনের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেনের ভাষ্য, স্থান পরিবর্তনজনিত জটিলতার কারণে সময় লেগেছে। নতুন স্থানে কাজ শুরু করে পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ঠিকাদারের প্রথম বিলের কিছু অংশ এখনো বাকি রয়েছে। বিলের ছাড় না পাওয়ায় ঠিকাদার কাজ বন্ধ রেখেছেন।






