রাজশাহীর রেশমে নেই রোশনাই
- রেশম সুতার উৎপাদন নেমেছে ৪০ থেকে ৪২ টনে
- ৭৬টি বেসরকারি কারখানার মধ্যে ৭০টিই বন্ধ
- তুঁত চাষের জমিও কমেছে
- দাম বাড়ায় কমেছে চাহিদা

সংগৃহীত ছবি
রাজশাহীর নাম উচ্চারিত হলে একসময় মনে ভেসে উঠত রেশমের মোলায়েম দীপ্তি। শহরের শোরুমগুলোয় ঢুকলেই চোখ জুড়িয়ে যেত ঝলমলে সিল্কের শাড়ি-পাঞ্জাবি, উজ্জ্বল থ্রি-পিসে। আজ একই শোরুমে দেখা যায় বেমানান চিত্র। তাকগুলোর বড় অংশে জায়গা দখল করে আছে ভারতীয় শাড়ি, চীনা কাপড়, নন-সিল্ক থ্রি-পিস আর রেডিমেড পোশাক। রেশম যেন এক প্রান্তে সরে দাঁড়িয়ে মুখ লুকাচ্ছে।
নগরীর সিল্ক ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন আর শুধু রেশমের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। ক্রেতাদের পছন্দ বদলেছে, এক্ষেত্রে দামই বড় বিবেচ্য। ঐতিহ্যের টান থাকলেও অনেকেই ঝুঁকছেন সস্তা বিকল্পে। তাই সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হয়েছে দোকানের তাকেও।
সপুরা সিল্ক মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপক সাইদুর রহমান আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘শুধু সিল্কপণ্য নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন। উৎপাদন খরচ বেশি, কিন্তু বাজার চায় কম দাম। ফলে বাধ্য হয়েই যুক্ত করতে হচ্ছে নন-সিল্কপণ্য।’
একসময় রাজশাহীর রেশম শিল্প ছিল স্বনির্ভর। তুঁত চাষ থেকে শুরু করে রেশম পোকা পালন, কোকুন উৎপাদন, সুতা তৈরি— সব মিলিয়ে ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ চক্র।
আজ সেই চক্র ভেঙে পড়েছে। বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ৪০০ টন রেশম সুতার চাহিদা এখনো আছে। কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৪২ টনে। অর্থাৎ চাহিদার বড় অংশই এখন পূরণ হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। ফলে স্থানীয় রেশম হারাচ্ছে স্বকীয়তা।
রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী উষা সিল্কের জেনারেল ম্যানেজার মো. জহুরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘রেশম উন্নয়ন বোর্ড কিংবা রেশম কারখানা শুধুই শো-আপ। এখানে কোনো উৎপাদন নেই। ফলে বাধ্য হয়ে আমাদের চীন থেকে রেশম সুতা আমদানি করতে হয়। তার কথায়, ‘মাত্র পাঁচ বছর আগে রেশম সুতার কেজি ছিল ৩-৪ হাজার টাকা। বর্তমানে সেই সুতা কিনতে হচ্ছে ৯ হাজার টাকায়। রেশম উন্নয়ন বোর্ড যদি সচল থাকত, তাহলে বিদেশ থেকে রেশম সুতা আমদানি কমত। কমত দেশি সুতার দামও। ফলে রেশম কাপড়ের দামও তুলনামূলক কমত।’
এই শিল্পের ধারাবাহিক সংকোচনের ছবি ফুটে ওঠে পরিসংখ্যানে— ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪৬ টন কোকুন থেকে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৮৮০ কেজি সুতা। আগের বছর উৎপাদন ছিল ১ হাজার ১৩৪ কেজি। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত উৎপাদন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৫০ কেজিতে।
জহুরুল ইসলাম আরও বলছিলেন, ১০ বছর আগে একটি রেশম শাড়ির সর্বনিম্ন দাম ছিল ৩-৪ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে সেই শাড়ির সর্বনিম্ন দাম ৯-১০ হাজার টাকা। ব্যয়বহুল হওয়ায় ক্রেতাদের চাহিদারও কিছুটা তারতম্য লক্ষ করা যাচ্ছে।
উৎপাদনের পাশাপাশি সংকুচিত হচ্ছে কাঁচামালের ভিত্তিও। তুঁত চাষের জমি কমে আসছে ধীরে ধীরে। ২০১৫ সালে এই জমির পরিমাণ ছিল ১৪৮ দশমিক ৫ একর, ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১৩৭ দশমিক ৬১ একরে।
রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার তুঁতচাষি আব্দুল আওয়াল বলছিলেন, ‘আমার বাপ-দাদারা তুঁত চাষ করত। বংশপরম্পরায় আমিও তুঁত চাষ করি। কিন্তু সেই চাষ কমিয়ে দিয়েছি। কারণ, তুঁত চাষে পরিশ্রম বেশি, লাভ কম। সরকারি সুযোগ-সুবিধা কম।’
বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. লিয়াকত আলী জানিয়েছেন, রাজশাহী বিসিক শিল্প এলাকার ৭৬টি বেসরকারি রেশম কারখানার মধ্যে ৭০টিই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। তার মতে, কাঁচামালের অভাবই এই স্থবিরতার মূল কারণ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. আমিনুজ্জমান সালেহ রেজা বলছিলেন, ‘বিপুল সম্ভাবনা ও সমৃদ্ধ ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও সরকারের ত্রুটিপূর্ণ নীতির কারণে দেশের রেশম শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এতে শেষ পেরেকটি ছিল রাষ্ট্রপরিচালিত রেশম কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া। এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে নিম্নমানের রেশম আমদানির অনুমতি দেওয়া, স্থানীয় বাজারে চীনের সস্তা রেশম সুতা ব্যবহারও এ শিল্প ধ্বংসে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।’
তিনি আরও বলছিলেন, ‘আমরা ধরেই নিয়েছি, রেশম শিল্প একটি অলাভজনক খাত। যেহেতু আমরা এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না, তাহলে বলতেই পারি, আমরা সমৃদ্ধ এ শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টাই করছি না।’ উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে এই অধ্যাপক বলেছেন, কর্তৃপক্ষের উচিত রেশম পোকার ডিম, রেশম গুটি, তুঁত পাতা এবং রেশম সুতা উৎপাদন— পুরো সিস্টেমটিকে একটি মডেল সিস্টেমে নিয়ে আসা। যেখানে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও সহায়তা করা হবে।
তার আরও পর্যবেক্ষণ, ‘রেশম শিল্পের জন্য উন্মুক্ত বাজার তৈরির কোনো বিকল্প নেই। কৃষকদের যদি সরকারের কাছ থেকে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা না দেওয়া হয়, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে রেশম শিল্পকে কখনোই পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক (অর্থ ও পরিকল্পনা) ড. এম এ মান্নান মনে করেন, সরকারিভাবে রেশম পোকার ডিম সরবরাহ এ শিল্পে বড় ভূমিকা রেখে আসছে। কিন্তু রেশমের উৎপাদন বাড়াতে দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে আসা উচিত।’ তার মত, ‘বেসরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা কঠিন হবে।’




