কালোবাজারে জ্বালানি তেলের তেলেসমাতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হবিগঞ্জে দৈনিক প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহার হলেও দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিক্রি হচ্ছে অনুমোদন ছাড়াই। জেলায় যেখানে লাইসেন্সধারী জ্বালানি এজেন্ট মাত্র পাঁচটি, সেখানে অনুমোদনহীন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা তিন শতাধিক। অভিযোগ রয়েছে, এসব দোকানে বিক্রি হওয়া জ্বালানির একটি অংশ অপরিশোধিত। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহনের ইঞ্জিন ও পরিবেশ। একই সঙ্গে সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এই ব্যবসা চললেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ গড়ে ওঠেনি।
বানিয়াচং উপজেলার বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন রাজু সম্প্রতি মোটরসাইকেলে জ্বালানি নেওয়ার পর মাঝপথে পড়েন বিপাকে। তিনি বললেন, ‘মোটরসাইকেল বিকল হওয়ায় গিয়েছিলাম মেকানিকের কাছে। তবে মেকানিক জানিয়েছিলেন নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারের কারণে নষ্ট হয়েছে ইনজেক্টর ও ফুয়েল পাম্প।’
হবিগঞ্জ শহরে প্রায় ২৫ বছর ধরে মোটরসাইকেল মেরামতের কাজ করছেন শরীফ আহমদ। তার অভিজ্ঞতায়, নিম্নমানের বা অপরিশোধিত জ্বালানি ব্যবহারে ইঞ্জিনে দ্রুত কার্বন জমে। ফলে ইনজেক্টর, ফুয়েল পাম্পসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ অল্প সময়েই নষ্ট হয়ে যায়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, কমে ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল। ‘এ ধরনের সমস্যা নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই গ্রাহক আসেন’— বললেন তিনি।
হবিগঞ্জ পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, জেলার ৯ উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ৬০ হাজার লিটার পেট্রলের বিপরীতে অনুমোদিত ফিলিং স্টেশনে বিক্রি হয় মাত্র ১৫ হাজার লিটার। ৮০ হাজার লিটার অকটেনের মধ্যে বিক্রি হয় ১৫ হাজার লিটার এবং ২ লাখ লিটার ডিজেলের মধ্যে অনুমোদিত পয়েন্টে বিক্রি হয় ৭০ হাজার লিটার। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার লিটার জ্বালানি তেল বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন দোকানের মাধ্যমে। যার মধ্যে রয়েছে ৪৫ হাজার লিটার পেট্রল, ৬৫ হাজার লিটার অকটেন এবং ১ লাখ ৩০ হাজার লিটার ডিজেল।
হবিগঞ্জ পেট্রোলিয়াম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান চৌধুরীর হিসাবে, জেলার ১৯টি ফিলিং স্টেশনে বছরে জ্বালানি তেল বিক্রি হয় প্রায় ১৫ কোটি টাকা। এ থেকে সরকার রাজস্ব পায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
তার দাবি, একই পরিমাণ জ্বালানি যদি অনুমোদিত ব্যবস্থার বাইরে বিক্রি হয়, তাহলে সরকার বছরে অর্ধকোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারাচ্ছে।
শহরের আনোয়ারপুর বাইপাস, লাখাই সড়ক, ফায়ার সার্ভিস সড়ক, উমেদনগর, নবীগঞ্জ সড়ক ও বানিয়াচং সড়কে দেখা গেছে, রাস্তার পাশেই সারিবদ্ধভাবে রাখা বোতল ও জারভর্তি জ্বালানি তেল।
নিয়ম অনুযায়ী, জ্বালানি বিক্রির স্থাপনার চারপাশে নিরাপদ দূরত্ব রেখে খোলা জায়গা থাকতে হয়। প্রয়োজন হয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের অনুমোদন। কিন্তু অধিকাংশ দোকানই গড়ে উঠেছে কয়েক ফুট জায়গার মধ্যে। অনেক দোকানেরই নেই লাইসেন্স। কিছু দোকান অতীতে সীমিত অনুমতি পেলেও সেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে বহু আগেই।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্যবহারের কারণে পরিবেশের জন্যও বাড়ছে ঝুঁকি। হবিগঞ্জ জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক হরিপদ দাসের ভাষ্য, ‘নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড, কালো ধোঁয়া এবং সূক্ষ্ম বস্তুকণা নির্গত হয়।
তার মতে, এসব দূষক শুধু বায়ুর মানই নষ্ট করে না, দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের শ্বাসতন্ত্র, হৃদরোগ এবং পরিবেশের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
হবিগঞ্জে প্রতিদিন ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৭০ শতাংশই যদি অনুমোদনের বাইরে বিক্রি হয়, তাহলে এই বিপুল সরবরাহ কোথা থেকে আসছে, কীভাবে তা পরিবহন হচ্ছে এবং কারা এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে— এসব প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর নেই।
যদিও নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানার কথা বলেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হবিগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক শ্যামল পুরকায়স্থ। তার তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবারও অতিরিক্ত মূল্যে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগে এক দোকানিকে জরিমানা করা হয়েছে ২ হাজার টাকা।
তবে তিনি স্বীকার করেন, বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে পুরো অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তার মতে, অবৈধভাবে জ্বালানি তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।




