উৎপাদন কমার পাঁচ কারণ
- ভোলায় আয় কমছে জেলেদের, বাড়ছে ঋণের বোঝা

ভোরের আলো ফোটার আগেই ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে নৌকা নিয়ে ছুটে যান হাজারো জেলে। কয়েক ঘণ্টা নদীতে কাটিয়ে দেন মাছের আশায়; কিন্তু দিনশেষে অনেকের জালে উঠছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগর থেকে ডিম ছাড়তে আসা ইলিশকে নদীপথে মোকাবিলা করতে হচ্ছে অবৈধ জাল, নাব্যসংকট, ডুবোচর, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। ফলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক চলাচল।
সরকারি পরিসংখ্যানে ইলিশ উৎপাদনে বড় ধরনের পতনের চিত্র না থাকলেও ভোলার জেলেরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। নদীতে আগের মতো পাওয়া যাচ্ছে না মাছ, আয় কমছে, বাড়ছে ঋণের বোঝা।
৪৫ বছর ধরে মাছ ধরছেন নুরুল ইসলাম। তিনি বললেন, ‘একসময় নদীতে ১৫-২০ মিনিট জাল ফেললেই ইলিশ পাওয়া যেত নৌকাভর্তি। এখন ছয় ঘণ্টা নদীতে থেকেও একটি মাছ না পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়।’ তার ভাষায়, নদী আছে; কিন্তু নেই আগের সেই মাছ। খরচ বাড়ছে, কমছে আয়।
উৎপাদনের হিসাব কী বলছে
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ভোলায় গত কয়েক বছরে ইলিশ উৎপাদনে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও বড় ধরনের ধস দেখা যায়নি। ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০৫ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৪ টনে। তবে কমেছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৬৮ হাজার ৬৭৪ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবারও বৃদ্ধির ধারায় ফিরেছিল উৎপাদন। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৮২ টন। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬৬ টন।
নদীতে কেন মিলছে না ইলিশ
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলছেন, ‘নদীতে মাছের সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে।’ বিশেষ করে জাটকা নিধন ও ডিমওয়ালা মাছ ধরাকে তিনি সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন। ‘সাগর থেকে নদীতে আসার পথে বিস্তীর্ণ এলাকায় পাতা থাকে অবৈধ জাল। এতে শুধু বড় মাছ নয়, বিপুল পরিমাণ জাটকাও ধরা পড়ে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ওপর পড়তে পারে’— বললেন তিনি।
এদিকে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন অবশ্য ভিন্ন একটি দিক তুলে ধরছেন। তার মতে, উৎপাদনে কিছু ওঠানামা থাকলেও মাছ একেবারে উধাও হয়ে গেছে— এমন দাবি ঠিক নয়। তবে মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।
ভোলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। এর বাইরে আরও বিপুলসংখ্যক অনিবন্ধিত জেলে মাছ ধরেন নদীতে। ফলে মোট উৎপাদন একই থাকলেও মাথাপিছু প্রাপ্তি কমে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।




