পদ্মার ভাঙনে বদলে গেছে চার ইউনিয়নের মানচিত্র

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বন্যার পর পদ্মার ভাঙনে সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার ৮০০ পরিবারের বাড়িঘর বিলীন। ছবি: আগামীর সময়
চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার ভাঙনে একের পর এক বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও আবাদি জমি বিলীন হচ্ছে নদীগর্ভে। এবার বন্যার পর নদীভাঙনে সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর, নামোজগন্নাথপুর, ফিল্ডেরহাট, কানছিরা, বোগলাউড়ি ও ঝাইলপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় অন্তত ৮০০ পরিবারের বাড়িঘর চলে গেছে নদীগর্ভে। ভাঙন আতঙ্কে মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলেই রাতবিরাতে মানুষ ছুটে আসছেন একে অন্যের বাড়িঘর সরাতে।
স্থানীয়রা জানান, গত চার-পাঁচ বছরে অনেক পরিবারকে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বাড়ি ভাঙতে হয়েছে। নদীভাঙনে হাজার হাজার মানুষ জমি হারিয়েছেন। বদলে গেছে নদীতীরের চেনা মানচিত্র। নারায়ণপুর, পাঁকা, উজিরপুর ও দুর্লভপুর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় নদী গত কয়েক বছরে প্রায় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার ভেতরে চলে এসেছে। বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে অনেকেই এখন ভূমিহীন ও বাড়িঘরহীন হয়ে পড়েছেন।
ভাঙনের কারণে মানুষের দুর্ভোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মসজিদের মাইকে ঘোষণা শুনেই স্থানীয়রা দলবেঁধে বাড়িঘর সরানোর কাজে নেমে পড়েন। সময় কম থাকায় গভীর রাতেও চলে এই কাজ। এক পরিবারের বাড়ি সরাতে অন্য পরিবারের লোকজনও এগিয়ে আসেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উজানে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে পদ্মার দুই তীরেই কয়েক বছরে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। নদীর দুই পাশে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত আবাদি জমি কেটে এখন অনেক জায়গায় ধুধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় ফারাক্কার গেট খুলে দেওয়ার পর নদীর মূল প্রবাহ কয়েকটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে নদীর এপার-ওপারের দূরত্ব কোথাও কোথাও প্রায় ১৫ কিলোমিটারে পৌঁছেছে।
পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক মন্ডল জানিয়েছেন, ভাঙনে চার ইউনিয়নের মানচিত্রই বদলে গেছে। এবার পানি সরে যাওয়ার পর প্রায় ৪ হাজার একর জমিতে গম, সরিষা ও ভুট্টার আবাদ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে বন্যার ধকল কাটিয়ে কৃষকদের হাতে নগদ টাকা না থাকায় সরকারি উদ্যোগে বীজ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন।
তিনি জানালেন, পাঁকা ইউনিয়নের নিশিপাড়া, দক্ষিণ পাঁকা, ২০ রশিয়া, জ্যাকপাড়া ও দোভাগী এবং পাশের ইউনিয়নের মনোহরপুর ও ফিল্ডেরহাট এলাকায় গত ১০ দিন ধরে ব্যাপক ভাঙন চলছে। এতে পাঁকা ও আশপাশের ইউনিয়নের প্রায় ৫০০ পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকে অন্যের জমিতে বসতি স্থাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
ফিল্ডেরহাট এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম, মোশাররফ হোসেন এম ও সাদিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, দুলাল, রোজবুল, মান্নান, রফিক, সালাম, জিয়াউল ও বাবরসহ অসংখ্য মানুষের বাড়িঘর নদীগর্ভে চলে গেছে। দ্রুত বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় মোশাররফ হোসেন এম বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. সাইমুম পারভেজের উদ্যোগে বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। দ্রুত কাজ শুরু হলে ভাঙনকবলিত মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম জানিয়েছেন, নদীভাঙন রোধে ২৩ জন ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ ও সংরক্ষণকাজ হবে। এর মধ্যে ১৬টি বামতীর এবং ৭টি ডানতীরের বাঁধ রক্ষার কাজ রয়েছে। বামতীরের ১৬টি প্রকল্পে ১ হাজার ৯৪০ মিটার এবং ডানতীরের ৭টি প্রকল্পে ৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার বাঁধ রক্ষার কাজ হবে।




