বরিশালের শীতলপাটি
ঐতিহ্যে ওঠে না সংসার খরচ
- আনা হবে সৃজনশীল অর্থনীতির আওতায়

শীতলপাটি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটছে গৃহবধূর। বাকেরগঞ্জের কাঁঠালিয়া থেকে তোলা
প্লাস্টিকের তৈরি পাটির প্রভাবে দিন দিন ধুঁকছে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী বরিশালের শীতলপাটি। সস্তা প্লাস্টিকের পাটিতে বাজার সয়লাব থাকায় সাধারণ মানুষ সেদিকেই ঝুঁকছে, যার ফলে অনেক পাটিকরই বাধ্য হয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন বাপ-দাদার এই পেশা। সংসারের খরচ মেটাতে কেউ কেউ এখনো পাটি বোনার কাজ ধরে রাখলেও দিন যত গড়াচ্ছে, তত কমছে পাটিকরের সংখ্যা।
বরিশালের বাকেরগঞ্জের রঙ্গশ্রী ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া গ্রামটি লোকমুখে পাটিকর গ্রাম নামেই পরিচিত। গ্রামটিতে প্রবেশ করলেই রাস্তার দুই ধারে চোখে পড়ে পাটি তৈরির মূল উপাদান পাইত্রা গাছ। আগে এই গ্রামের বাড়িগুলোয় অনেকে মিলে একসঙ্গে শীতলপাটি বোনার দৃশ্য দেখা গেলেও এখন চিত্রটি ভিন্ন।
কাঁঠালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ভবতোষ পাটিকর বলছিলেন, জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই পূর্বপুরুষদের মতো শীতলপাটি বোনার কাজ করছি। তবে বর্তমানে এ কাজ করে টিকে থাকা অনেক কষ্ট। মানুষ এখন অল্প দামের প্লাস্টিকের পাটি কিনছে, ভুলে গেছে শীতলপাটির ঐতিহ্য ও গরমে শান্তির কথা। গ্রামে এখন পাটি তৈরির পরিবারের সংখ্যা কমে মাত্র ৪৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
একই গ্রামের সুমা মিত্রের কণ্ঠেও একই হতাশা। ১০ বছর বয়স থেকে এই কাজ করা সুমা বলছিলেন, ‘টানা তিন দিন পরিশ্রম করে একটি শীতলপাটি তৈরি করে পাইকারদের কাছে ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করি। অথচ একটি পাটি তৈরিতে ৬০০ টাকার বেতি প্রয়োজন। তাতে আমাদের কী লাভ থাকে, সেটি বুঝতেই পারছেন। তারপর পরিশ্রম তো আছেই।’
তবে সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এক গ্রাম, এক পণ্য কর্মসূচির আওতায় শীতলপাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বরিশাল বিভাগের ১২টি গ্রামে এখনো প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ শীতলপাটি শিল্পের সঙ্গে জড়িত। আকার ও রঙ ভেদে তারা ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় একটি পাটি বিক্রি করেন, যা খুচরা বাজারে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পাটির পাশাপাশি পাইত্রা গাছ দিয়ে ৪৫ ধরনের ব্যাগ তৈরি হয়। একটি পরিবার বছরে দেড় লাখ টাকার মতো পাটি বিক্রি করে। তবে লাভ থাকে খুবই সীমিত। বিদেশেও তাদের তৈরি পণ্য রপ্তানি হয়, তবে কোন দেশে তারা সেটি নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
প্লাস্টিকের কারণে শীতলপাটির কদর না থাকায় বাকেরগঞ্জের হেলেঞ্চা গ্রামের সৌরভ চন্দ্র দে জানিয়েছেন, এখন আর পাটি দিয়ে সংসার চালানো যায় না। সরকার যদি শীতলপাটি বিদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করত, তবে জীবনমানের কিছুটা উন্নয়ন হতো।
উপযুক্ত পারিশ্রমিক না পেয়ে পেশা বদল করা জগদীশ দাসের ভাষ্য, সংসার চালাতে না পেরে দুই বছর ধরে তিনি অটোরিকশা চালাচ্ছেন। যে পেশায় সন্তানদের মুখে ঠিকমতো ভাত তুলে দেওয়া যায় না, সেই পেশায় থেকে কোনো লাভ নেই।
সার্বিক বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক খায়রুল আলম সুমন বললেন, ‘ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি কারিগরদের কীভাবে সহযোগিতা করে এই শিল্পের আরও প্রসার ঘটানো যায়, সে বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করব।’




