৫ হাজার শিশুর জন্ম আমেনা বেওয়ার হাতে

অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূরা আমেনা বেওয়ার বাড়িতে এসে তার পরামর্শ নেন - আগামীর সময়
মধ্যরাতে পাশের বাড়ির এক নারীর প্রসবব্যথা শুরু হলো। আশপাশে প্রশিক্ষিত কোনো ধাত্রী নেই। হাসপাতালও অনেক দূরের পথ। নিরুপায় হয়ে ডাকা হলো কিশোরী আমেনাকে। যদিও প্রসব করানোর মতো কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না তার। তবে পারিবারিকভাবে নারীদের স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতার অভিজ্ঞতা থাকায় শুরু করলেন চেষ্টা। প্রথমবারের চেষ্টায় সফল হয়ে কোলে তুলে নিলেন নবজাতককে। তারপর শিশুর কান্নার সঙ্গে এখন আমেনা বেওয়ার হাসির গল্পের সাক্ষী অনেকে। ষাটের দশকে ধাত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন আমেনা বেওয়া। তারপর গ্রামের পর গ্রাম ছুটে অক্লান্ত পরিশ্রমে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার নবজাতককে। নানা সংকট আর সংসারের টানাপড়েনও তাকে থামাতে পারেনি এ কাজ থেকে। তাই তিনি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের কাছে হয়ে উঠেছেন আস্থার প্রতীক।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার মধুপুর গ্রামে ১৯৪৭ সালে জন্ম আমেনা বেওয়ার। ষাটের দশকে কিশোরী আমেনার সঙ্গে একই এলাকার জব্বার হোসেনের বিয়ে হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে স্বামীর হাত ধরে ছয় বছরের কন্যাসন্তান জেলেখা বেগমকে নিয়ে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের জদ্দিপাড়ায় এসে খাসজমিতে ঠাঁই নেন। অভাবের সংসারেও এক ছেলে ও দুই মেয়ের মা আমেনার সুখের কমতি ছিল না। আশির দশকে হঠাৎ স্বামী মারা যান। পরে মারা যায় বড় ছেলেও। স্বামী ও ছেলের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। তবে মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে ধাত্রীর কাজ করে চলেছেন এ বয়সেও।
কুর্শা ডাঙ্গাপাড়া এলাকার মোসলেমা বেগম বললেন, ‘আমার প্রথম সন্তান মোস্তাকিমের বয়স এখন ১৯ বছর। তার জন্মের সময় অনেক ভয় কাজ করছিল। কিন্তু আমেনা চাচির মাধ্যমে খুব সহজেই আমার সন্তানের জন্ম হয়। তার প্রতি আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ।’
‘প্রসববেদনা উঠলেই আমেনা খালাকে ডাকি। আমার তিন সন্তানের জন্মের সময় তিনিই ধাত্রী হিসেবে সেবা দিয়েছেন। বিনিময়ে তার কোনো চাহিদা নেই। কেউ একটি শাড়ি, কেউবা কয়েক কেজি চাল দেন। খুশি হয়ে যে যা দেন, তাই নেন’— জানালেন জদ্দিপাড়া এলাকার মোতমাইন্না বেগম।
কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আফজালুল ইসলাম জানালেন, তার এলাকায় আমেনা বেওয়া দীর্ঘদিন ধরে ধাত্রী হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন সুনামের সঙ্গে।
বয়সের ভারে অনেকটা নুয়ে পড়া আমেনা বেওয়ার কথা, ‘খুব কম বয়সে এ কাজ শুরু করেছি। তখন আমার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। কিন্তু একজনের বিপদে পাশে দাঁড়ানোর অনুভূতি থেকে ধাত্রী হিসেবে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রসববেদনার সময় পাশে থেকে কাজ করছি। এ বয়সেও মানুষের সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’
‘পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ রংপুরে কয়েকটি প্রশিক্ষণ নিয়েছি। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারি, কোনটি স্বাভাবিক প্রসব হবে। তবে প্রসবকালীন প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলেই ঝুঁকি না নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিই’, যোগ করেন তিনি।




