‘বাচ্চাদের ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পাই’

নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির
নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের (৪৪) দাফন সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেল পাঁচটায় তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে সন্ধ্যায় তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাত ৮টার দিকে উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় একটি চায়ের দোকানের সামনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
নিহত আলিফ ফকির বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল ‘রূপসী বাংলা’র নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে স্থানীয় বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ ও ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি।
নিহত আলিফ ফকির কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ডিটপুর গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন। তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা ও চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি এবং দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান রয়েছে।
ঘটনার রাতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় স্ত্রীকে আলিফ বলেছিলেন, ‘বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি।’ দেড় বছরের শিশুপুত্রকে স্ত্রীর কোলে দিয়ে বের হওয়া আলিফের সেই কথাই যে জীবনের শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
স্বামীর নিথর দেহের পাশে বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে আনন্দিতা সাংমা বলেন, ‘বাচ্চাদের যখন ভাত খাওয়াচ্ছিলাম, তখন গুলির শব্দ পাই। ভেবেছিলাম পটকা ফুটছে। এর কিছুক্ষণ পরেই শুনি আমার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে। আমি দৌড়ে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সে মাটিতে পড়ে আছে। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যাই। তখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি তো আর তাকে ফিরে পাব না; কিন্তু যারা আমার দুটি অবুঝ শিশুকে পিতৃহারা করল, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার রাতে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন আলিফ ফকির। দোকান থেকে বের হয়ে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের দিকে যাওয়ার সময় তিনি বুঝতে পারেন, মোবাইলটি দোকানে ফেলে এসেছেন। তিন থেকে চার মিনিটের মধ্যে তিনি আবার দোকানে ফিরে আসেন। ফোনটি নিয়ে বের হওয়ার মুহূর্তে ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী দুই যুবক দোকানে এসে সিগারেট চান। এর পরপরই আলিফকে লক্ষ্য করে কয়েকটি গুলি ছোড়া হয়।
চায়ের দোকানি রবিন রাংসা বলেন, ‘আমি চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম। আলিফ ফকির ফোন নিতে ফিরে এলে দুজন যুবক এসে সিগারেট চায় এবং পরপর পাঁচটি গুলি করে। ভয়ে আমি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি। ঘাতকদের একজন লুঙ্গি ও অন্যজন থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরা ছিল।’
গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন আলিফকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পরপরই নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন এবং দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ খানসহ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। সেখান থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করে পুলিশ।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে এটি পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পুরো জেলায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে।’
উল্লেখ্য, সাংবাদিকতার মাধ্যমে স্থানীয় অপরাধ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় এর আগেও হামলার শিকার হয়েছিলেন আলিফ ফকির। গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করেছিল।



