এ কষ্টের শেষ কবে

ই গ্রামে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসবাস। অথচ যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও নদীর ওপর নির্মিত হয়নি একটি স্থায়ী সেতু।
রামু উপজেলা সদরের চৌমুহনী স্টেশন থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বাঁকখালী নদী। নদীর ওপারে ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বীপ শ্রীকুল ও ফুলনীরচর গ্রাম। দুই গ্রামে প্রায় দুই হাজার পরিবারের বসবাস। অথচ যুগের পর যুগ পেরিয়ে গেলেও নদীর ওপর নির্মিত হয়নি একটি স্থায়ী সেতু। ফলে নদী পারাপারে নৌকা ও ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা। বর্ষা এলেই সেই ভরসা হয়ে ওঠে আতঙ্ক। বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢলে নদীর পানি বাড়লে উত্তাল স্রোত পেরিয়ে নৌকায় চলাচল করতে হয় শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের। কখনো স্রোত এতটাই বেড়ে যায় যে, বন্ধ হয়ে যায় নৌকা চলাচলও। তখন নদী পার হওয়ার ঝুঁকি নিতে হয় ভাঙা সাঁকো কিংবা কলাগাছের ভেলায়।
স্থানীয়দের দাবি, ভারী পাহাড়ি ঢলের সময় নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে ঘটেছে প্রায় ২০ জন ভেসে যাওয়ার ঘটনাও। তাদের অভিযোগ, রামু শহরের এত কাছে থেকেও সেতুর অভাবে তারা যেন বিচ্ছিন্ন কোনো জনপদের বাসিন্দা।
এদিকে প্রতিদিনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হয় নদীর ওপারের শিক্ষার্থীদের। রামুর খিজারী স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহাদাত হোসেন বলেছে, ‘ভারী বৃষ্টির সময় নৌকায় নদী পার হতে ভয় লাগে। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে নৌকায় উঠতে হয়। বই-খাতা বা পোশাক ভিজে গেলে সেদিন আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না।’
এই নদী পারাপারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৭২ বছর বয়সী খুইল্যা মিয়ার জীবন। প্রায় ৪৫ বছর ধরে বাঁকখালী নদীতে নৌকা চালাচ্ছেন তিনি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও তিনি মানুষকে নদী পার করেন সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত। প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে নেন ১০ টাকা। স্থানীয়দের হিসাবে, প্রতিদিন তার নৌকায় নদী পার হন ৩০০-৪০০ মানুষ। খুইল্যা মিয়াও চান, মানুষের এই নির্ভরতার অবসান হোক। তিনি বলেছেন, ‘নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু হলে মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ আর থাকবে না।’
সেতুর অভাবে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হয় জরুরি চিকিৎসার সময়। স্থানীয় শিক্ষক রিকন বড়ুয়া বললেন, ‘কোনো রোগীকে হাসপাতালে নিতে অ্যাম্বুলেন্স নদীর ওপারে যেতে পারে না। অনেক সময় নৌকায় পারাপারও সম্ভব হয় না। তখন কলাগাছের ভেলা কিংবা সাঁকোর ওপর দিয়ে রোগী নিতে হয়। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু, বয়স্ক ও গুরুতর অসুস্থ রোগীদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
৬৫ বছর বয়সী ফাতেমা বিবিও এমন দুর্ভোগের শিকার। তিনি বলেছেন, ‘অসুস্থ হলে ভারী বর্ষণের মধ্যেও নৌকায় নদী পার হতে হয়। অসুস্থতার সঙ্গে তখন যোগ হয় নদী পার হওয়ার ভয়।’
ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দুই গ্রামের মানুষ নৌকা ও সাঁকোর ওপর নির্ভর করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে। দ্রুত বাঁকখালী নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’




