আগামীর সময়

চার বছরে মাদারীপুরে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে ২৩ শতাংশ

চার বছরে মাদারীপুরে বিবাহ বিচ্ছেদ বেড়েছে ২৩ শতাংশ

ছবি : এআই

বাল্যবিবাহ ও সম্পর্কে আস্থাহীনতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর ওপর প্রশ্ন তুলছে। সারা দেশের মতো মাদারীপুরেও দিন দিন বেড়েই চলছে বিবাহ বিচ্ছেদ।

জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাদারীপুরে সর্বমোট বিয়ে হয়েছে ৮ হাজার ১০৬টি। আর বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৫২১টি। শতাংশ হিসেবে বিচ্ছেদ হয়েছে মোট বিয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ। ২০২৪ সালে জেলাটিতে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে ৪৬.৬ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৫৪.৩ শতাংশ এবং ২০২২ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে ৪৩.৮ শতাংশ।

উপজেলার হিসেবে, গত বছর মাদারীপুর সদর উপজেলায় বিয়ে হয়েছে ২২২৬টি আর বিচ্ছেদ হয়েছে ২১৭৭টি; শিবচরে বিয়ে হয়েছে ২৪৩১টি, বিচ্ছেদ হয়েছে ১২৩৭টি; কালকিনি বিয়ে হয়েছে ১৮২৮টি, বিচ্ছেদ হয়েছে ৯২১টি আর রাজৈরে বিয়ে হয়েছে ১৬২১টি, বিচ্ছেদ হয়েছে ১০৯৬টি।

উপজেলা ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী বিবাহ বিচ্ছেদ সবচেয়ে বেশি হয়েছে মাদারীপুর সদর উপজেলায়। যেখানে বিয়ে ও বিচ্ছেদের সংখ্যার ব্যবধান মাত্র ৪৯টি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদারীপুর পৌর শহরের এক নারী জানান, দুই বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। ১৪ মাসের মাথায় তাদের সংসার ভেঙে যায়। তার স্বামী অন্য কোনো নারীর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রাখছে। বিষয়টি জেনে যাওয়ার ফলে দাম্পত্য সম্পর্ক আর টিকে থাকেনি।

কালকিনি উপজেলার এক প্রবাসী বলেছেন, ‘আমি প্রবাসে থাকাকালীন স্ত্রীর সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে যায়। দেশে ফেরার পর জানতে পারি তার অন্য জায়গায় সম্পর্ক হয়েছে। এরকম সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ পাওয়ার পর আমি বিচ্ছেদের পথে হাঁটি।’

মাদারীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা করিম নামের এক প্রবাসী জানান, ২০১৪ সালে স্ত্রী সন্তান রেখে উন্নত জীবনের আশায় কাতার যাই। সেখানে ভালো টাকায ইনকাম করতেছিলাম। স্ত্রীকে বিশ্বাস করে তার কাছে প্রতি মাসের বেতনও পাঠাতাম। বিদেশ যাওয়ার পাঁচ বছর পরে আমার স্ত্রী টাকা পয়সা স্বর্ণালংকার সব নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে চলে যায়।

বিচ্ছেদ প্রসঙ্গে বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার মাওলানা জাহিদ আলম উল্লেখ করেন, তালাক বা বিচ্ছেদের পেছনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। এ ব্যাধি নিরাময় না হলে বিবাহ বিচ্ছেদ বাড়তেই থাকবে।

‘পারিবারিকভাবে সম্পন্ন হওয়া বিবাহে তালাকের ঘটনা অনেকটাই কম। তাছাড়া দম্পতির মধ্যে কলহ সৃষ্টি হলে সেখানে দুই পরিবারের সহযোগিতায় তা মেটাতে পারে। ছোটখাটো দাম্পত্য কলহ হলে দুজনই ছাড় দিয়ে বিষয়টির সমাধানের পথ বের করা উচিত’— তিনি যোগ করেন।

মাদারীপুর জজকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান সোহেলের ভাষ্য, বিবাহ বিচ্ছেদ অপরাধ নয় বরং এটি দম্পতির মৌলিক অধিকার। বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারী ও পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে। তবে সম্প্রতি বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়ে যাওয়া সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। তবে এ বিষযয়ে আইনি ও সামাজিক উভয় দিক বিবেচনা করতে হবে।

ম্যারেজ ও ডিভোর্স কনসালটেন্ট আলমগীর হোসেন বলছেন, বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদের অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ে এবং বেকারত্ব। অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়ে মানসিক ও আর্থিকভাবে সংসার পরিচালনায় অক্ষম থাকে। এতে করে দাম্পত্য জীবনে ভুল বোঝাবুঝি ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়, যার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে।

এ বিষয়ে মাদারীপুর জেলা রেজিস্ট্রার আমির হামজা জানান, এ বছর যে পরিমাণে বিবাহ হয়েছে এর মধ্যে বিচ্ছেদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এটা মাদারীপুরবাসীর জন্য সবচাইতে দুঃখজনক। এর মূল কারণ হলো পরকীয়া আর এই পরকীয়া একটা ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে যা মানুষের জীবনে বিচ্ছেদের ঘটনা পর্যন্ত দাঁড়ায়।

এদিকে সদর উপজেলায় বিবাহ বিচ্ছেদ বেশি হওয়ার বিষয় জানতে চাইলে বিবাহ তালাক রেজিস্টার মাওলানা আলী হোসেন জানিয়েছেন, গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষরা পরকীয়ায় লিপ্ত বেশি, এতে একে অপরের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। যার কারণেই শহরে বেশি বিচ্ছেদ হয়ে থাকে।

    শেয়ার করুন: