চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি : রাজশাহীতে আমের বাজারে ধস

ছবি: আগামীর সময়
ঈদের ছুটি কাটতে না কাটতেই রাজশাহীর আমের বাজারে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের দরপতন। চাহিদার তুলনায় বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় জেলার বিভিন্ন মোকামে দাম নেমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন গুটি ও গোপালভোগ আমের চাষিরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারদর কমে যাওয়ায় অনেকেই লোকসানের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।
রাজশাহীর সবচেয়ে বড় আমের মোকাম পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর হাটে আজ সোমবার সকাল থেকেই ছিল চাষি ও ব্যবসায়ীদের ভিড়। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ভ্যান, অটোরিকশা ও ছোট যানবাহনে করে আম নিয়ে আসেন চাষিরা। হাটে পৌঁছানোর পর আড়তদাররা ভ্যানের ওপর থেকেই আমের মান যাচাই করে দর নির্ধারণ করছেন। তবে বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় দরদামে খুব একটা প্রতিযোগিতা দেখা যায়নি । ফলে অনেক চাষিকেই বাধ্য হয়ে কম দামেই আম বিক্রি করতে হচ্ছে।
বানেশ্বর আমের মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে গোপালভোগ আম প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়। অথচ গত ২২ মে মৌসুমের শুরুতে এই আমের দাম উঠেছিল প্রায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। একইভাবে ১৫ মে থেকে বাজারে আসা গুটি আমের মণপ্রতি দাম তখন ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে সেই দাম নেমে এসেছে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।
২৫ মে থেকে বাজারে উঠতে শুরু করেছে রানিপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ। এর মধ্যে রানিপছন্দের সরবরাহ তুলনামূলক কম থাকলেও লক্ষ্মণভোগ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা মণ দরে। গত বছর একই সময়ে এই জাতের আমের দাম দেড় হাজার টাকার নিচে নামেনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে ৩০ মে থেকে বাজারে আসা ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর আমের মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায়। যা অন্যান্য জাতের তুলনায় অনেক বেশি। তবে এই আম গতবছর এই সময়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে।
বানেশ্বর হাটে আম বিক্রি করতে আসা পুঠিয়ার ভুবননগর গ্রামের চাষি আমিনুল ইসলাম বলেছেন, প্রায় ২০ বিঘা জমিতে তার আমবাগান রয়েছে। সারের দাম, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিক ব্যয় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় আমের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘এত খরচ করে আম উৎপাদন করছি, কিন্তু বাজারে এসে ন্যায্য দাম পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে চাষিরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়বেন।’
শুধু আমিনুল ইসলাম নন, হাটে আসা অনেক চাষির কণ্ঠেই ছিল একই ধরনের হতাশা। তাদের অভিযোগ, ভালো ফলন হলেও বাজারে ক্রেতা কম থাকায় আমের দাম ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই চাষিদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোরবানির ঈদের কারণে কয়েকদিন ধরে আমের বাজারে চাহিদা কমে যায়। মানুষের ব্যস্ততা ছিল কোরবানির পশু কেনাবেচা, মাংস সংরক্ষণ ও বিতরণ নিয়ে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কুরিয়ার ও পরিবহন সেবাও সীমিত আকারে চলেছে। ফলে ঢাকাসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে আম পাঠানো ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে পাইকারি বাজারে।
বানেশ্বর হাটে গোপালভোগ কিনতে আসা ব্যবসায়ী ইমান আলী জানান, ‘গত বছর এই সময়ে গোপালভোগের মণ ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ টাকা। এবার দাম অনেক কম। বাজারে আমের জোগান বেশি, কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা নেই।’
একই মত ব্যবসায়ী মো. রাজিবুরের। তিনি বলেছেন, ‘ঈদের সময় মানুষ সাধারণত ফলের চেয়ে মাংস নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকে। ফলে আমের চাহিদা কমে যায়। তবে এখন ধীরে ধীরে অফিস-আদালত খুলছে, মানুষ কর্মস্থলে ফিরছে। এতে বাজারে আবার গতি আসতে পারে।’
দুর্গাপুর উপজেলার পালি গ্রামের আমচাষি রাজু মিয়ার মতে, বর্তমান দামে আম বিক্রি করে শ্রমিক, পরিবহন ও বাগান পরিচর্যার খরচ মেটানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘এবার ঈদের ছুটিতে গোপালের কপাল খারাপ। এই দামে আম বিক্রি করা মানে লোকসান গোনা।’
তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে পুরোপুরি হতাশ নন ব্যবসায়ীরা। তাদের ধারণা, ঈদের ছুটি শেষ হওয়ায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে বাজার আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করবে। হাটের ব্যবসায়ী মো. সগির উদ্দিনের ভাষ্য, ‘প্রতি বছরই ঈদের সময় আমের বাজারে কিছুটা মন্দাভাব থাকে। মানুষ যখন কর্মস্থলে ফিরে যায়, তখন সঙ্গে করে আম নিয়ে যায়। ইতোমধ্যে সেই চাহিদা তৈরি হতে শুরু করেছে। কুরিয়ার ও পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল হলে পাইকারি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১০ জুন থেকে ব্যানানা ম্যাংগো ও ল্যাংড়া, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা এবং ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি আম সংগ্রহ করা যাবে। এছাড়া পাকলে সারা বছরই কাটিমন ও বারি আম-১১ সংগ্রহের সুযোগ থাকবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহীর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ৮০০ কোটি টাকা। অনুকূল আবহাওয়া এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এ বছর অধিকাংশ মুকুল টিকে গেছে। ফলে ফলনও হয়েছে সন্তোষজনক।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানালেন, ‘এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হয়েছে। বাজারে সরবরাহও বেশি। ফলে দামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে মৌসুম যত এগোবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, বাজার পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হয়ে উঠবে বলে আমরা আশা করছি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ফলন কৃষকের জন্য যেমন সুখবর, তেমনি বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ চেইন ঠিকভাবে পরিচালিত না হলে সেই সুফল অনেক সময় কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। তাই উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণ, বিপণন ও দ্রুত পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নও এখন সময়ের দাবি।




