বিচারকের প্রশ্ন ‘শিশু আয়াতের সঙ্গে কেন এই নৃশংসতা?’

ছবি: আগামীর সময়
পাঁচ বছরের শিশু আলীনা ইসলাম আয়াতকে কেটে ছয় টুকরো করে হত্যার মোটিভ তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে উদঘাটন হয়নি বলে আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন।
আদালত এ-ও বলেছেন, হত্যা মামলায় মোটিভ প্রতিষ্ঠা করা বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
অভিযোগপত্রে মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশে আয়াতকে অপহরণ করে হত্যার দাবি করে তদন্ত সংস্থা পিবিআই। বিচারক সেটা নাকচ করলেও পিবিআইয়ের তদন্তের প্রশংসা করেছেন।
আজ বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস ৩০ পাতার রায় পড়ে শোনান। রায়ে আসামি আবির আলীকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আয়াতকে হত্যার অপরাধে মৃত্যুদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
লাশ কেটে ছয় খণ্ড করে গুমের অপরাধে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় আদালত তাকে আরও পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উচ্চ আদালতের দুটি রায়ের উদাহরণ টেনে বললেন, আয়াত হত্যার মোটিভ সুপ্রতিষ্ঠিত হয়নি। কিন্তু হত্যা মামলায় মোটিভ প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ নয়। হত্যাকাণ্ড যে ঘটেছে এটা শরীরের খণ্ডিত বিভিন্ন অংশ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয়েছে, এটি একটি পূর্বপরিকল্পিত নৃশংস নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। আসামি পূর্বপরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে তার বাবার বাসায় নিয়ে খাটে শুইয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ কেটে বিভিন্ন অংশ সাগরে ভাসিয়ে দেয়।
আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার বিষয়ে বিচারক রায় ঘোষণার সময় বললেন, হত্যাকাণ্ড একটি জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধ। কিন্তু এখানে আসামি শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। হত্যার পর মৃতদেহের ওপর চরম নির্যাতন সংঘটিত করেছে। মৃতদেহ আত্মরক্ষার কোনো অধিকার রাখে না। এরপরও সেই মৃতদেহকে ছয় টুকরো করে বিকৃতি ও অবমাননা অপরাধের নৃশংসতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা মানবিক মূল্যবোধের প্রতি চরম অবজ্ঞা, যা সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী।
‘এই অপরাধের প্রতি কোনো ধরনের নমনীয়তা হলে তা হবে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি’- যোগ করেন বিচারক।
২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর বিকালে চট্টগ্রাম নগরীর দক্ষিণ হালিশহরের নয়ারহাট এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার মেয়ে আলীনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়েছিল। পিবিআই তাদের বাসার ভাড়াটিয়া তরুণ আবিরকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যে ৩০ নভেম্বর নগরীর ইপিজেড থানার আকমল আলী রোডের শেষপ্রান্তে নালাসংলগ্ন স্লুইচগেট এলাকা থেকে আয়াতের বিচ্ছিন্ন দুই পায়ের অংশ এবং পরদিন খণ্ডিত মাথা উদ্ধার করে।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক মনোজ কুমার দে বললেন, ‘দ্রুত ধনী হওয়ার আশায় আয়াতকে অপহরণ করে বড় অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের কৌশলের কথা আবির জবানবন্দিতে জানিয়েছিল। বেকার জীবনের নানা হতাশা ও দ্রুত ধনী হওয়ার চেষ্টার বিষয়টি সে ডায়েরিতেও লিখেছিল। কিন্তু পরে সে আয়াতকে অপহরণ করলেও মুক্তিপণ দাবি করেনি। মোটিভ উদঘাটন না হওয়ার বিষয় বললেও বিচারক তদন্তে সন্তুষ্ট হওয়ার কথা বলেছেন। আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট।’
রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এক মাসের মধ্যে আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি করেছেন আয়াতের বাবা সোহেল রানা ও মা শাহিদা আক্তার তামান্না। সকাল থেকে আয়াতের প্ল্যাকার্ড নিয়ে আবিরের ফাঁসি দাবি করে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন এলাকার লোকজন।




