শাটল ট্রেনের আনন্দযাত্রায় পাথর নিক্ষেপের বিষাদ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাটল ট্রেন। রনি দে, চট্টগ্রাম
দেশের আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনের মতো প্রাণবন্ত যাত্রা নেই। প্রতিদিন হাসি, আড্ডা, গান, তর্ক-বিতর্কে মুখর এই ট্রেনে চড়ে শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরের সবুজ ক্যাম্পাসে পৌঁছান হাজারো শিক্ষার্থী। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চলন্ত শাটল ট্রেনে বারবার পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় সেই আনন্দময় যাত্রা পরিণত হচ্ছে আতঙ্কে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে শাটল ট্রেনে অন্তত ১৫টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন একাধিক শিক্ষার্থী ও ট্রেনচালক। প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সচেতনতা কার্যক্রম চালালেও স্থায়ী উন্নতি হয়নি পরিস্থিতির।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্টেশনে শাটল ট্রেন থামলে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা করে স্থানীয় কিছু কিশোর ও যুবক। তারা কখনো মোবাইল ফোন বা ব্যাগ ছিনতাই করে নেমে যায় চলন্ত ট্রেন থেকে। শিক্ষার্থীরা বাধা দিলে ক্ষুব্ধ হয়ে নিক্ষেপ করে পাথর। আবার অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের ছোড়া পাথরও এসে আঘাত হানে ট্রেনের কামরায়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পাথরের আঘাতে গুরুতর আহত হন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এক ছাত্রী। পরে একই এলাকায় নাক ও ঠোঁট ফেটে যায় আরেক শিক্ষার্থীর। এপ্রিল মাসে আমিন জুট মিল এলাকায় আহত হন শাটল ট্রেনের চালক। সর্বশেষ গত ৫ মে গুরুতর আহত হন হিসাববিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত ফাতেমা।
সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সজিব রহমান তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, একদিন বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের ট্রেনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। ট্রেন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ বাইরে থেকে ছোড়া একটি পাথর আঘাত করে সামনে বসা এক ছাত্রীর কপালে। মুহূর্তেই রক্তাক্ত হন তিনি।
শিক্ষার্থীদের মতে, ঝাউতলা, ষোলশহর ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এসব স্থানের আশপাশে থাকা বস্তি এলাকায় অবস্থানকারী কিশোর গ্যাং বা দুর্বৃত্তরা প্রায়ই পাথর নিক্ষেপ করে ট্রেন লক্ষ্য করে।
বর্তমানে প্রায় ২৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মধ্যে অন্তত আট হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন যাতায়াত করেন শাটল ট্রেনে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে জেলা পুলিশ সুপার তহুরা জান্নাত বলেছেন, চলন্ত ট্রেনে পাথর আঘাত করার সময় সাধারণত ঘটনাস্থল থেকে কিছুটা দূরে অবস্থান করে নিক্ষেপকারী। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে তাদের।
যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে রেলওয়ে পুলিশ ও চাকসু। পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিট পুলিশিং ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের মাধ্যমে চেষ্টা চলছে জনসচেতনতা বাড়ানোর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মোহাম্মদ কামরুল হোসেন জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটছে, সেসব স্থানের পার্শ্ববর্তী বস্তি ও অবৈধ দখল উচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনা চলছে প্রশাসন ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। নিরাপত্তা জোরদারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত নিরাপত্তাকর্মীও।
নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শাটল ট্রেন সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদারের দাবিতে ১১ দফা দাবি উত্থাপন করেছেন শিক্ষার্থীরা। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টহল বৃদ্ধি, ট্রেনে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ, জানালায় সুরক্ষা নেট স্থাপন, পর্যাপ্ত বগি সংযোজন, বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা এবং রেললাইনের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো।
চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ ইসহাক ভুঁইয়া জানিয়েছেন, পাথর নিক্ষেপ বন্ধে একাধিক বৈঠক হয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। জানালায় সুরক্ষা নেট বসানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে স্থায়ী নেট বিঘ্ন ঘটাতে পারে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক ও উন্মুক্ত পরিবেশে যাতায়াতে। এ কারণে বিকল্প হিসেবে অস্থায়ী নেট স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।





