সাক্ষাৎকার
‘রাসায়নিক কীটনাশক অকার্যকর হয়ে পড়ছে, ভেষজ নির্যাস হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান’

চবির উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক
মশক নিধনে প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, উদ্ভিজ্জ নির্যাসের সম্ভাবনা এবং আগামী দিনের মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা কেমন হওয়া উচিত— এসব বিষয়ে আগামীর সময়ের সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আগামীর সময়ের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল মামুন।
আগামীর সময়: চট্টগ্রামে দীর্ঘদিন ধরে মশক নিধনে ডেল্টামেথ্রিন ও টেমিফস ব্যবহার করা হচ্ছে। বছরের পর বছর একই রাসায়নিক ব্যবহারে মশা কি প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে? আগামী দিনে সিটি করপোরেশনের ওষুধ প্রয়োগ পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: শুধু দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে মশা প্রতিরোধী হয়ে গেছে, ল্যাব টেস্ট ছাড়া এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবে না। তবে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরির শঙ্কা প্রবল। সেটি প্রমাণ করতে স্থানীয় মশার ওপর সংবেদনশীলতা (সাসেপটিবিলিটি) পরীক্ষা দরকার। যেমন, ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ঢাকা ও টাঙ্গাইলের এডিস এবং কিউলেক্স মশায় ডেল্টামেথ্রিন প্রতিরোধী ক্ষমতা পাওয়া গেছে। সুতরাং, আগামী দিনে শুধু ওষুধ ছিটালেই হবে না; ওষুধটি স্থানীয় মশার ওপর এখনো কার্যকর কি না, তা নির্দিষ্ট সময় পরপর বৈজ্ঞানিক উপায়ে যাচাই করতে হবে।
আগামীর সময়: বাসাবাড়ির বারান্দা বা ছাদে নিম, তুলসী, পুদিনা বা লেমনগ্রাসের মতো গাছ লাগালে কি মশার উপদ্রব থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: ঐতিহ্যগতভাবে মানুষ এসব উদ্ভিদ ব্যবহার করে আসছে। এসব গাছের নির্যাস বা তেলে মশা প্রতিরোধী উপাদান আছে। এগুলোকে মশা তাড়ানোর সহায়ক বা পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে রাখা যেতে পারে। তবে শুধু ব্যালকনি বা ছাদে কয়েকটি গাছ লাগালেই পুরো বাসার মশা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে— এমন কোনো শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
আগামীর সময়: রাসায়নিক কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে ভেষজ নির্যাস দিয়ে লার্ভা ধ্বংস করা কতটা বিজ্ঞানসম্মত? ভবিষ্যতে এর বাণিজ্যিক প্রয়োগের সুযোগ কতটা দেখছেন?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: আমরা গত পাঁচ বছর ধরে এটি নিয়ে গবেষণা করছি। ২০২৫ সালে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি’তে আমাদের গবেষণার একটি অংশ প্রকাশিত হয়েছে। আমরা ২৫০টি ঔষধি উদ্ভিদের নির্যাস পরীক্ষা করে ২৫টিতে এডিস মশার লার্ভা মারার সক্ষমতা পেয়েছি। এর মধ্যে ১৫টি উদ্ভিদের নির্যাস শতভাগ লার্ভা ধ্বংস করতে পারে। মশা মারার জন্য যেসব রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয়, সেগুলো মাটি, পানি ও বাতাসকে বিষাক্ত করছে। আবার অকার্যকারিতার কারণে মশার লার্ভাও নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে দীর্ঘস্থায়ী ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে এই ভেষজ নির্যাস আগামী দিনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামীর সময়: নগরায়ণ ও সৌন্দর্যায়নের জন্য লাগানো গাছপালা কি মশার প্রজননস্থল তৈরি করছে? মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: গাছ নিজে কোনো সমস্যা নয়, তবে গাছের পাতা, কাণ্ডের গঠন, টব বা ড্রেনেজ ব্যবস্থায় পানি জমে মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও গাছের গর্ত বা পাতার কক্ষে পানি জমার বিষয়ে সতর্ক করেছে। সিটি করপোরেশনের উচিত রাস্তার পাশে বিদেশি সৌন্দর্যবর্ধক উদ্ভিদের পরিবর্তে দেশীয় বনজ, ফলজ ও ঔষধি গাছ লাগানো। অনেক গুরুত্বপূর্ণ দেশীয় ঔষধি উদ্ভিদ আজ বিলুপ্তির পথে। আমি দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার পাশে বা ফ্লাইওভারের নিচে তিন স্তরবিশিষ্ট ঔষধি উদ্ভিদের বনায়ন করার প্রস্তাব দিয়ে আসছি। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদও সংরক্ষণ করা যাবে।
আগামীর সময়: চট্টগ্রাম নগরের খাল ও জলাশয়গুলো কচুরিপানায় ভরা। মশার প্রজনন ঠেকাতে এসব জলাশয় ব্যবস্থাপনায় উদ্ভিদতাত্ত্বিক কোনো সমাধান আছে কি?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: এখানে উদ্ভিদের উপস্থিতির চেয়ে এর ঘনত্ব ও পানির প্রবাহ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঘন জলজ উদ্ভিদ পানির প্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং লার্ভাকে শিকারি প্রাণীর হাত থেকে রক্ষা করে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন ব্যবস্থাপনা, যাতে পানির প্রবাহ বজায় থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, এডিস মশার লার্ভা ছায়াযুক্ত ও জমে থাকা পানিতে বেশি হয়। বহমান পানিতে লার্ভা কম থাকে। তাই নালা বা খালের পানি পরিষ্কার রেখে প্রবাহমান রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।
আগামীর সময়: বছরের পর বছর ফগার মেশিনে ছিটানো রাসায়নিক কীটনাশক পরিবেশ ও উপকারী পতঙ্গের কতটা ক্ষতি করছে? পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় মশক নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায় কী হতে পারে?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: যেকোনো রাসায়নিক কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানুষ, প্রাণী ও সমগ্র পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর বিকল্প হিসেবে জৈব নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলো চালু করতে হবে। যেমন মাছ চাষের মাধ্যমে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, অণুজীব ও উদ্ভিদের নির্যাস ব্যবহার করা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন করে বাড়ির আশপাশের নালা-নর্দমা পরিষ্কার রাখতে হবে। নির্দিষ্ট সময় পরপর কীটনাশকের কার্যকারিতা যাচাই করা এবং মশা প্রতিরোধী হয়ে উঠছে কি না, তা জানতে জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমেই রাসায়নিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব নিয়ন্ত্রণের দ্বার উন্মোচন করতে হবে।
আগামীর সময়: মশাবাহী রোগ প্রতিরোধে টিকার ট্রায়াল চলছে। ব্রাজিলের মতো আমাদের দেশেও কি ডেঙ্গুর টিকা চালু করা সম্ভব?
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: নীতিগতভাবে সম্ভব, তবে জাতীয়ভাবে চালু করার আগে স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, কোনো দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণের তীব্রতা, বয়সভিত্তিক সংক্রমণের হার, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হার এবং ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও সুরক্ষা যাচাই করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
আগামীর সময়: আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ ওমর ফারুক: আগামীর সময়কেও ধন্যবাদ।






