গলির গোলকধাঁধা রেয়াজুদ্দিন বাজারে

চট্টগ্রামের দৈনন্দিন কেনাকাটার অন্যতম প্রাণপ্রবাহ। ছবি: আগামীর সময়
পকেটে বাজারের ফর্দ নিয়ে রিকশা থেকে নামলেন এক তরুণ। নাম তার রবিউল ইসলাম। উদ্দেশ্য কসমেটিকস আর কিছু কাপড় কেনা। কিন্তু বাজারের প্রথম গলিতে ঢোকার ১০ মিনিটের মাথায় টের পেলেন, তিনি দিক হারিয়েছেন। যে গলি দিয়ে ঢুকেছিলেন, শতচেষ্টা করেও সেটি আর খুঁজে পাচ্ছেন না। পাশ দিয়ে ছুটে চলা এক কুলির মাথায় বিশাল ঝাঁকা। তাতে মুরগি ও নানা সবজি। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে হাঁকডাক— ‘এই আপা আসেন, এইখানে থ্রি-পিস, শাড়ি সব আছে।’
এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, চট্টগ্রাম নগরের ‘রেয়াজুদ্দিন বাজার’-এ প্রতিদিন আসা লাখো মানুষের চিরচেনা অভিজ্ঞতা। প্রবাদ আছে, এই বাজারে যে গলি দিয়ে কেউ ঢোকে, সেই গলি দিয়ে আর বের হতে পারে না। ‘সুই থেকে জাহাজ’— এমন কিছু নেই, যা এখানে পাওয়া যায় না।
জমিদার দেওয়ান বৈদ্যনাথের সেগুন বাগান কেটে শেখ রেয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির হাত ধরে যে বাজারের পত্তন হয়েছিল, তা আজ চট্টগ্রামের দৈনন্দিন কেনাকাটার অন্যতম প্রাণপ্রবাহ। তবে এই জমজমাট বাণিজ্যের ঠিক পেছনেই লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন শোকের ইতিহাস। সেটি জানাচ্ছি পরে। আগে শুনুন প্রাচীন এ বাজারের গলির গোলকধাঁধা এবং বারোয়ারি কারবার।
রেয়াজুদ্দিন বাজারে গলির কোনো শেষ নেই। ইলেকট্রিক লেন, মুরগি হাটা, মাংস হাটা, ডিমের গলি, জেবুন্নেসা রোড, আব্দুল্লাহ সিদ্দিকি রোড, সাইফুদ্দিন সিদ্দিকি লেন, রফিক উদ্দিন সিদ্দিকি রোড, রহমতুন্নেসা রোড, তামাকুমণ্ডি লেনসহ অসংখ্য গলি রয়েছে। এসব আবার শুঁটকি গলি, কাঁচাবাজার গলি, কাপড়ের গলি, জুতার গলি থেকে শুরু করে হালের মোবাইল গলি নামে পরিচিত। একেক গলির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য একেক রকম। এক গলি থেকে অন্য গলিতে যাওয়ার সুড়ঙ্গের মতো ছোট-সরু পথগুলো যেন একেকটি গোলকধাঁধা।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে জুবিলী রোডের সাফিনা হোটেলের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া বাহার লেন ধরে এই গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ি। হাঁটতে হাঁটতে কানে আসছিল ক্রেতা ডাকার চেনা আওয়াজ। দুই দোকানের কর্মচারীর মধ্যে চলছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নিয়ে চিরন্তন খুনসুটি। তাদের আলাপ পেরিয়ে সামনে যেতেই রফিক উদ্দিন সিদ্দিকি রোড। সেটি ধরে হাঁটতে গিয়ে সামনে পড়ে সোমাইয়া গার্মেন্টেস। ক্রেতা নেই। মালিক ও কর্মচারী মিলে আলাপ জুড়েছেন। তাদের কথার মাঝখানে নাক গলালাম। জিজ্ঞেস করলাম ব্যবসা কেমন চলছে? মালিক শাহ আলমের ঝটপট জবাব, ‘মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের হাতে টাকা থাকলে ব্যবসা চাঙ্গা। আর না থাকলে ব্যবসা মন্দা। এখন মন্দা চলছে। মধ্যপ্রাচ্য অস্থির থাকায় প্রবাসীদের পাঠানো টাকা কমেছে, যার প্রভাব পড়েছে বাজারে।’
তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সামনে যেতে ডান পাশে রূপরাজ নামে কাপড়ের দোকান। মালিক ও ব্যবসায়ী নেতা মাহমুদুল হকও শোনালেন হতাশার কথা, ‘দৈনিক বিক্রি এখন ৩০ হাজার টাকা। অথচ দোকান খরচই ৭ হাজার। লাভ থাকে ২০ শতাংশেরও কম। খরচের পর আর কিছু থাকে না।’
হতাশার চেনা সুর পেরিয়ে স্টেশন রোড ধরে ফলের গলির দিকে পা বাড়ালাম। এবার লক্ষ্য আমতল পৌঁছানো। দুই পাশে লোভনীয় নানা শুকনো ফল। থরে থরে সাজানো। কিশমিশ, খেজুর, আলু বোখারা, কাজু বাদাম, কাঠ বাদাম কী নেই! লোভ সামলে সামনে হাঁটি। ঢুকে পড়ি জেবুন্নেসা রোডে। মাংস হাটা পৌঁছে নিজেই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাই। পথ হাতড়ে হাতড়ে কোনোমতে আবার একই স্টেশন রোডে ফেরা। এরপর এস এ সিদ্দিকি রোড, রফিক উদ্দিন সিদ্দিকি রোড আর বাহার লেন মাড়িয়ে সোজা আমতল।
ব্যবসায়ীদের মতে, ৪২ একর জায়গা ঘিরে গড়ে ওঠা এই বাজারে মার্কেট আছে দুই শতাধিক। আর দোকান ২৫ হাজার। প্রতিদিন এখানে কয়েকশ কোটি টাকার লেনদেন হয়। সাধারণ আলপিন কিংবা বিয়ের পাগড়ি থেকে শুরু করে আলিশান ঘরের আসবাব কিংবা বিদেশি ইলেকট্রনিকস, সবই মেলে। দেশি পণ্যের পাশাপাশি ভারতের কাশ্মীরি শাল, বার্মিজ আচার, থাইল্যান্ডের কসমেটিকস কিংবা চীনের ইলেকট্রিক পণ্যে ঠাসা এই বাজার। পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের এমন মেলবন্ধন পুরো বাংলাদেশে আর দ্বিতীয়টি নেই।
রেয়াজুদ্দিন বাজারের গোলকধাঁধা নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন পাশের নন্দনকাননে বেড়ে ওঠা কবি ও ছড়াকার ওমর কায়সার। বললেন, ‘যখন দশম শ্রেণিতে পড়ি, তখন বাজার করতে সেখানে যেতাম। তখন নগরের অলিগলিতে এত বাজার ছিল না, পুরো শহরের প্রধান বাজার ছিল এটি। তবে তখন এত উঁচু উঁচু মার্কেট বা এত ঘিঞ্জি অলিগলি ছিল না।’
এবার ফিরে আসি রেয়াজুদ্দিন বাজারের যাত্রা শুরুর ইতিহাসে। ভৌগোলিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এর ঠিক পাশেই রয়েছে বটতলী রেলওয়ে স্টেশন আর বিপরীতে প্রাচীন চৈতন্যগলি কবরস্থান। এখন আর পাহাড় নেই। যার আদি নাম ছিল ‘কুমদান পাহাড়’। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘কুমদান’ শব্দটি মূলত আরবি ‘কমদান’ শব্দের বিকৃত রূপ, যার অর্থ ‘শোক’। প্রাচীনকালে চট্টগ্রামে আসা আরব বণিক ও নাবিকদের মৃত্যু হলে এই পাহাড়ে সমাহিত করা হতো। সেই আরব বণিকদের স্মৃতিবিজড়িত কমদান পাহাড়ের পাদদেশেই আজকের এই বারোয়ারি বাজার। আর এর ঠিক অন্য প্রান্তেই ছিল তামাক বেচাকেনার ঐতিহাসিক ‘তামাকুমণ্ডি’ মৌজা।
এই কুমদান পাহাড়ের পূর্ব দিক এবং স্টেশন রোডের উত্তর দিকের সম্পূর্ণ বিশাল এলাকাটি একসময় ছিল প্রখ্যাত জমিদার দেওয়ান বৈদ্যনাথের জমিদারির অন্তর্গত। সেই আমলে সেখানে ছিল দেওয়ানের বিশাল বাগানবাড়ি আর ছায়াঘেরা এক নিঝুম সেগুনবাগিচা। নির্জন সেই পাহাড়ে দেওয়ানের উত্তরাধিকারীদের কাছ থেকে জমি কিনে নেন শেখ মোহাম্মদ ওয়াশীল সিদ্দিকি।
তিনি ছিলেন চট্টগ্রামের প্রথম মুসলমান বিএবিএল ডিগ্রিধারী শেখ রেয়াজুদ্দিন সিদ্দিকির বাবা। ১৮৮৩ সালে এলাহাবাদের বিখ্যাত ‘মুইর সেন্ট্রাল কলেজ’ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে এসে শেখ রেয়াজুদ্দিন সিদ্দিকি এই অঞ্চলের উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন শুরু করেন। মূলত তার হাত ধরেই দেওয়ানের সেই সেগুনবাগিচা কেটে আজকের এই বাজারের গোড়াপত্তন হয়। রেয়াজুদ্দিনের সেই অনন্য প্রচেষ্টাকে স্মরণীয় করে রাখতেই কালক্রমে এই কোলাহলমুখর বাণিজ্য এলাকার নাম হয়ে ওঠে আজকের ‘রেয়াজুদ্দিন বাজার’। কে জানত শতবর্ষী এই বাজার একদিন এই অঞ্চলের কোটি মানুষের কেনাবেচার প্রধান ও বিশেষ এক হাট হয়ে উঠবে!




