এলএনজির অভাবে বন্ধ এক্সিলারেট টার্মিনাল, সরবরাহ নামল ৫৫০ মিলিয়নে

শিডিউল অনুযায়ী এলএনজিবাহী জাহাজ না আসায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে কক্সবাজারের মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে। আজ বুধবার দুপুর পৌনে তিনটার দিকে টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে দুই টার্মিনাল মিলিয়ে এলএনজি সরবরাহ ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে এখন শুধু সামিটের টার্মিনাল দিয়ে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে।
গত ২১ জুলাই থেকে দেশ জুড়ে গ্যাস সরবরাহে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে। এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগা, সেটি মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগা এবং সূচি অনুযায়ী এলএনজিবাহী জাহাজ বাংলাদেশে না পৌঁছানোয় এই সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশের মোট গ্যাসের ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশ সরবরাহ করে এলএনজি। ফলে একটি টার্মিনাল বন্ধ কিংবা সরবরাহ কমে গেলেও সামগ্রিক গ্যাস সরবরাহে এর বড় প্রভাব পড়ে।
জানা গেছে, এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল ২১ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ থাকায় গ্যাস সরবরাহে চরম সংকটে পড়ে দেশ। এরপর এলএনজিবাহী জাহাজ না পেয়ে সামিটের টার্মিনালও এক দিন বন্ধ ছিল। সামিট চালুর পর এখন এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল আবার বন্ধ হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও সংকটের দিকে যাচ্ছে।
কবে নাগাদ নতুন এলএনজিবাহী জাহাজ আসবে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেনি সরকারি সংস্থা পেট্রোবাংলা ও রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এ বিষয়ে জানতে এই দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।
তবে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাদের দাবি, ২৩ আগস্ট সিঙ্গাপুর থেকে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে জাহাজটি কবে নাগাদ বাংলাদেশে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই। ফলে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে আপাতত স্বস্তির কোনো খবর নেই।
বছর জুড়ে নির্ধারিত এলএনজি পেতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ওমান ও কাতার সরকারের পৃথক সরকারি পর্যায়ের (জিটুজি) দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকা এবং এলএনজি সরবরাহকারী দেশে হামলার কারণে চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর বিকল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে চড়া দামে এলএনজি কিনছে সরকার।
অভিযোগ উঠেছে, গ্যাস সংকট সামাল দিতে সরকার আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনলেও শিডিউল অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত এলএনজি দেশে পৌঁছাচ্ছে না। এ অবস্থায় দ্রুত এলএনজি সরবরাহ নিশ্চিত করতে জ্বালানিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্য সফর করছেন।
টার্মিনাল কীভাবে কাজ করে
কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মোট সক্ষমতা ১১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনে এসব টার্মিনালে সরবরাহ করে। টার্মিনালগুলো নিজেরা এলএনজি কিনতে পারে না। ভাসমান টার্মিনালের মূল কাজ হলো আমদানি করা এলএনজিকে গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা।
সরকারি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, মঙ্গলবার বিকালেও দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। বুধবার সকাল থেকে তা কমে আসে। দুপুর পৌনে তিনটার দিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুধু সামিটের টার্মিনাল থেকে ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।
জিটিসিএল জানিয়েছে, সোমবার আমদানি করা এলএনজি ও দেশে উৎপাদিত গ্যাস মিলিয়ে মোট সরবরাহ ছিল ২২৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। মঙ্গলবার দুপুরে তা কমে ২০৭৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুধবার দুপুরের পর মোট গ্যাস সরবরাহ আরও কমে ১৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামতে পারে।
শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসনির্ভর স্টিল মিল ও ডাইং কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যত বন্ধ রয়েছে। আবাসিক গ্রাহক ও সিএনজি স্টেশনেও গ্যাসের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী বিএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেন গুপ্ত বলেছেন, ‘ক্রেতার কাছে নির্ধারিত পণ্য পৌঁছাতে লাইট ডিজেল এনে উৎপাদন চালু রেখেছিলাম। গ্যাসের চেয়ে এই জ্বালানির দাম চার গুণ বেশি। এত বেশি দামি জ্বালানি পুড়িয়ে রড উৎপাদন করতে গেলে দাম অনেক বেশি পড়বে। দুশ্চিন্তায় আছি, কী করব, কীভাবে সামাল দেব?’






