২ হাজার কিলোমিটার মরুপথ হাঁটলেন ষাটোর্ধ্ব নারী

রোজি স্ট্যান্সার ৬৯ দিনে হেঁটেছেন প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পথ।
ব্রিটিশ অভিযাত্রী রোজি স্ট্যান্সার ৬৯ দিনে পায়ে হেঁটে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমের নাজরান থেকে উত্তর-পশ্চিমের লোহিত সাগর উপকূল পর্যন্ত এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী ছিল উটের কাফেলা। তিনি হেঁটেছেন প্রাচীন ‘ইনসেন্স রুট’ বা ধূপ-বাণিজ্যের ঐতিহাসিক পথ ধরে।
ষাটোর্ধ্ব এই অভিযাত্রী এই যাত্রাকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী অভিযান বলে উল্লেখ করেছেন। প্রতিদিন গড়ে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছে নারী অভিযাত্রীদের এই দলটিকে। প্রচণ্ড গরম, বালিয়াড়ি, পাথুরে উপত্যকা ও দুর্গম ভূখণ্ড—প্রতিদিনই ছিল নতুন চ্যালেঞ্জ। দিনের পর দিন জনবসতিহীন এলাকায় হাঁটতে হলেও উটগুলোই বহন করেছে খাবার, পানি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
যাত্রাপথে তাঁরা অতিক্রম করেন সৌদি আরবের দুটি বিশাল মরুভূমি—এম্পটি কোয়ার্টার ও নাফুদ। পাশাপাশি সারাওয়াত পর্বতমালা, হিমা, বিশা, মদিনা, খাইবার, আল-উলা, তাবুক এবং শেষ পর্যন্ত নিওম হয়ে লোহিত সাগরের তীরে পৌঁছান। প্রাচীনকালে এই পথ দিয়েই আরব উপদ্বীপ থেকে ধূপ, সুগন্ধি ও মূল্যবান পণ্য বাণিজ্যিক কাফেলার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছাত।
ইতিহাসের পথ ধরে এক অনন্য অভিজ্ঞতা
অভিযান শেষে রোজি বলেন, এই সফর তাঁর জীবন বদলে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, “একটি অভিযান মানেই অজানাকে আবিষ্কার করা। কিন্তু সৌদি আরবের বৈচিত্র্য, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য আমাদের সব পূর্বধারণাকে ছাড়িয়ে গেছে।”
১০ হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো শিলাচিত্রের পাশে বসে মধ্যাহ্নভোজের অভিজ্ঞতাকে তিনি জীবনের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত বলে বর্ণনা করেন। আল-উলার ঐতিহাসিক নগরী এবং হেগ্রার নিস্তব্ধ প্রত্নস্থলও তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। তাঁর মতে, এসব স্থান শুধু অতীতের নিদর্শন নয়, বরং হাজার বছরের সভ্যতা ও বাণিজ্য ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
তবে শুধু ইতিহাস নয়, সৌদি আরবের মানুষের আতিথেয়তাও তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বলেন, “পথে যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সবাই অসাধারণ আন্তরিক ও উদার ছিলেন। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের বাড়িতে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হতো। সব আমন্ত্রণ গ্রহণ করলে হয়তো গন্তব্যে পৌঁছানোর বদলে শুধু ওজনই বাড়ত!”
কঠিন পথ, বদলে যাওয়া ধারণা
রোজির মতে, এই যাত্রায় তিনি আধুনিক সৌদি আরবের আরেকটি চিত্রও দেখেছেন। পানি সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় দেশটির উদ্যোগ তাঁর নজর কেড়েছে। পাশাপাশি সৌদি নারীদের পরিবর্তিত ভূমিকা সম্পর্কেও তাঁর ধারণা বদলেছে। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, কারুশিল্পী কিংবা গৃহিণী—বিভিন্ন পেশার নারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি মনে করেন, তাঁরা নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেই নতুন সুযোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন।
তাঁর ভাষায়, কোনো দেশ বা সংস্কৃতি সম্পর্কে দূর থেকে ধারণা তৈরি করার চেয়ে মানুষের সঙ্গে সরাসরি মিশে তাদের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই অভিযানে সেটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান প্রাপ্তি।
তবে অভিযান মোটেই সহজ ছিল না। তীব্র গরম, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা, পথ হারানোর আশঙ্কা, এমনকি সাপ ও বিচ্ছুর মুখোমুখিও হতে হয়েছে দলটিকে। মদিনার লাভাক্ষেত্র অতিক্রম করার সময় রোজির পায়ে প্লান্টার ফ্যাসাইটিস ধরা পড়ে। এরপরও তিনি ব্যথা নিয়ে টানা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছান।
ষাটের ঘরে পা দিলেও রোজির অভিযাত্রা থামছে না। তাঁর কথায়, “বুটজোড়া এখনই তুলে রাখছি না। মরুভূমির অধ্যায় শেষ। এবার নতুন কোনো পরিবেশে নতুন অভিযানের প্রস্তুতি নেব। সৌদি আরব চিরকাল আমার হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে থাকবে।”
সূত্র: আরব নিউজ





