প্রকৃতি প্রত্যয়
বৃষ্টিভেজা আঙিনায় উলটকম্বলের গল্প

উলটকম্বল
হিজলগাছটিতে ফুল ফুটল কি না— তা দেখতে আমার প্রায়ই যাওয়া হয় পায়রাবন্দ বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের কোয়ার্টার এলাকার কাছে। কখনো হেঁটে, ক্যাম্পাসে রাউন্ড দেওয়ার ফাঁকে, কখনো আবার কোনো স্টাফের পুরনো বাইসাইকেল নিয়ে। আসলে গাছপালার সঙ্গে আমার একধরনের নীরব সখ্য। তাই সুযোগ পেলেই খোঁজ নিই— স্নেহের গাছগুলো কেমন আছে! কোনটিতে নতুন ফুল এলো, কোন ফলটি আর একটু বড় হওয়ার অপেক্ষায় আছে, আর কোনটি গাছ থেকে সংগ্রহের উপযোগী হয়ে উঠল।
বর্ষা শুরুর কয়েক দিন পর এমনই এক সকালে চোখ আটকে গেল একটি নরম স্বভাবের গুল্মজাতীয় গাছে। বৃষ্টির জলে চারপাশ তখন ধুয়ে-মুছে একেবারে সতেজ। ভেজা মাটির গন্ধে বাতাস ভারী। সেই সবুজের ভিড়ে গাছটিকে দেখে মনে হলো, যেন এতদিন সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল— আজ হঠাৎ নিজের পরিচয় দেওয়ার সময় হয়েছে।
গাছটির নাম উলটকম্বল। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Abroma augusta। ইংরেজিতে একে বলা হয় Cotton Abroma কিংবা Devil’s Cotton। একসময় এটি Sterculiaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে পরিচিত ছিল। উলটকম্বলের উচ্চতা সাধারণত ৮ থেকে ৯ ফুট পর্যন্ত হতে পারে। খুব বেশি ডালপালা নেই, তবে তার পাতাগুলো বেশ বৈচিত্র্যময়। নিচের দিকের পাতাগুলো বড়— দেখতে অনেকটা স্থলপদ্মের পাতার মতো। ওপরের পাতাগুলোর গোড়া হৃৎপিণ্ডাকৃতির, সবুজ পানপাতার কথা মনে করিয়ে দেয়; শীর্ষভাগ ক্রমেই সরু হয়ে এসেছে। পাতার এই ভিন্ন ভিন্ন রূপ যেন একই গাছে প্রকৃতির দুই ধরনের আঁকিবুঁকি।
সবকিছুকে ছাপিয়ে তার ফুলের রঙই প্রথম নজর কাড়ে। উজ্জ্বল বেগুনি ফুল! বর্ষার ভেজা সবুজের মধ্যে সেই রঙ যেন একটুখানি গোপন আগুন। এপ্রিল-মে মাসে ফুল ফোটে। এরপর জুলাই-আগস্টে আসে ফল। ফলের আকৃতি পাঁচ কোণের— দূর থেকেও চোখে পড়ার মতো। ভেতরে থাকে অসংখ্য বীজ। মনে হয়, ছোট্ট একটি ফলের মধ্যে সে ভবিষ্যতের কতগুলো নতুন জীবনের সম্ভাবনা জমিয়ে রেখেছে।
গাছটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার মনে পড়ল আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী ড. নওয়াজেশ আহমদের অ্যালবামধর্মী বই ‘বাংলার বনফুল’-এর কথা। সাহিত্য প্রকাশ থেকে ২০০৬ সালে প্রকাশিত বইটিতে উলটকম্বল যেন নিজেই মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে।
তার কণ্ঠে যেন একটুখানি অভিমান ছিল—‘আমার দুঃখ কি জানো? প্রাচীন বা নব্য ভেষজ বিজ্ঞানের লেখায় আমার গুণের কথার কোনো উল্লেখ নেই। এমনকি রাজনিঘনটুতেও নয়।’
কিন্তু ইতিহাসের পাতায় নাম না থাকলেই কি কোনো গাছের গল্প শেষ হয়ে যায়? বনবাসী মানুষের কাছে নাকি উলটকম্বলের গুণাগুণ বহু আগেই পরিচিত ছিল। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যের অনুসন্ধানে এক বৈদ্যপ্রবরের পুঁথিতে এর উল্লেখের কথা জানা যায়—‘উলটকম্বল মিত্যাঘ্যং বন্যং বনেচরৈঃ প্রিয়ম।’
অর্থাৎ বনবাসীর কাছে এই গাছটি ছিল পরিচিত ও প্রিয়। তারা হয়তো এর গোপন গুণের খবর নিজেদের মধ্যেই রেখে দিয়েছিল।
পরে ১৮৭২ সালে Indian Medical Gazette-এ ভুবনমোহন সরকার উলটকম্বলের মূলের রসের ঔষধিগুণ সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করেন বলে ড. নওয়াজেশ আহমদ উল্লেখ করেছেন। লোকজ ও ভেষজ চিকিৎসার ধারায় এরপর গাছটি বিশেষ পরিচিতি লাভ করে, বিশেষত নারীদের বিভিন্ন ঋতুজনিত সমস্যার চিকিৎসায় এর ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রকৃতির প্রতিটি গাছের মতোই উলটকম্বলের ভেষজ ব্যবহারেও রয়েছে সতর্কতার প্রয়োজন। পুরনো গ্রন্থ, লোকজ জ্ঞান কিংবা প্রচলিত ভেষজ ব্যবহারের তথ্যকে আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। বিশেষ করে গর্ভাশয়, ক্যানসার বা অন্য কোনো জটিল রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো গাছের মূল বা রস ব্যবহার বিপজ্জনক হতে পারে। প্রকৃতির গাছকে ভালোবাসার অর্থ তার গুণকে সম্মান করা, আবার তার ব্যবহার সম্পর্কে বিজ্ঞানসম্মত সতর্কতাও মেনে চলা।
বাংলাদেশ ও পূর্ব ভারতের বনাঞ্চলকে উলটকম্বলের আদি আবাসভূমি বলা হয়। তবে বনেই শুধু নয়, বাড়ির ভিটার এক কোণেও সে দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। শহরের অনেক বাড়ির আঙিনায়ও তার দেখা মেলে। হয়তো আমরা প্রতিদিন পাশ দিয়ে চলে যাই, অথচ খেয়াল করি না— আমাদের চেনা চারপাশেই কত অচেনা গল্প দাঁড়িয়ে আছে।
সেদিন বর্ষাভেজা সেই সকালে উলটকম্বলের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হয়েছিল, গাছেরা আসলে খুব কম কথা বলে। তবু তাদের পাতায়, ফুলে, ফলে আর ঋতুবদলের ভেতর দিয়ে তারা নিজেদের ইতিহাস বলে যায়। শুধু শুনতে জানতে হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক






