ব্যাঙ নাচ, বুনো ফুল আর পাগলামিতে ভরা এক উৎসব

গ্রীষ্মের দীর্ঘতম দিনটিকে স্বাগত জানাতে সারা বিশ্বের মানুষই মেতে ওঠে নানা আয়োজনে। তবে সুইডিশদের মতো এত জাঁকজমক আর পাগলামিতে ভরা উৎসব বোধহয় আর কোথাও হয় না! হলিউড অভিনেত্রী আলিসিয়া ভিকান্দার একবার মার্কিন টক শো-তে হাই হিল জুতো পরেই নেচে দেখিয়েছিলেন সুইডেনের সেই বিখ্যাত ‘ব্যাঙ নাচ’। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। এই একটা দিনে পাঁচ থেকে পঁচানব্বই বছরের সব সুইডিশ যেন এক হয়ে যায় ‘মিডসামার’ উৎসবে। এটি শুধু একটি ছুটি নয়, সুইডিশ সংস্কৃতির প্রাণ।
প্রকৃতির কোলে লাল কুটিরের গল্প
মিডসামার মানেই শহরের কোলাহল ছেড়ে প্রকৃতির কাছে ছুটে যাওয়া। সুইডিশদের একটা বড় অংশ এই সময়টাতে চলে যান গ্রামীণ এলাকায় নিজেদের ‘সামার হাউজে’। মাঠের মধ্যে বা সমুদ্রের তীরে কাঠের তৈরি ছোট ছোট লাল রঙের এই বাড়িগুলো যেন একেকটি স্বপ্নের ঠিকানা। যাদের এমন বাড়ি নেই, তারাও বন্ধুদের কটেজে অতিথি হন। উদ্দেশ্য একটাই—সবুজ প্রকৃতির মধ্যে প্রিয়জনদের নিয়ে বছরের সেরা সময়টা কাটানো।
রূপকথা, জাদু আর বালিশের নিচে সাত ফুল
এই উৎসবের শিকড় লুকিয়ে আছে বহু প্রাচীন নর্স প্যাগান বা পৌত্তলিক যুগে। লোকবিশ্বাস বলে, মিডসামারের রাতটি জাদুকরি। এই রাতে বাস্তব আর আধ্যাত্মিক জগতের দেয়াল নাকি মুছে যায়! গাছের পাতায় পাতায় ভর করে অলৌকিক নিরাময় ক্ষমতা।
আজকের আধুনিক যুগেও সুইডিশ তরুণীরা একটি মিষ্টি ঐতিহ্য মেনে চলেন। তারা মাঠ থেকে সাত রকমের বুনো ফুল তুলে এনে রাতে বালিশের নিচে রেখে ঘুমান। বিশ্বাস করা হয়, স্বপ্নে তারা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনসঙ্গীর দেখা পাবেন। অতীতে সুস্বাস্থ্যের জন্য ভোরের শিশিরভেজা ঘাসে খালি পায়ে হাঁটা, এমনকি নগ্ন হয়ে গড়াগড়ি খাওয়ার রেওয়াজও ছিল। চুলে ফুলের মালা পরা তো এখনো এই উৎসবের অন্যতম ফ্যাশন।
মেপোলের চারধারে অদ্ভুত ‘ব্যাঙ নাচ’
মিডসামার ইভের মূল আকর্ষণ হলো বার্চ পাতা আর বুনো ফুল দিয়ে সাজানো একটি বিশাল কাঠের খুঁটি বা মেপোল খাড়া করা। এরপর সবাই হাত ধরাধরি করে গান গাইতে গাইতে এর চারপাশে নাচেন। এর মধ্যেই আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ‘লিটল ফ্রগস ড্যান্স’ বা ব্যাঙ নাচ। ডাঙায় ব্যাঙ যেভাবে লাফায়, হাত দুটো কান আর পিঠের পেছনে নাড়িয়ে ঠিক সেভাবেই অঙ্গভঙ্গি করতে হয়। গানটির মূল কথা হলো— ‘ব্যাঙের কোনো কান বা লেজ নেই!’ শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই নাচে মেতে ওঠেন সব বয়সী মানুষ।
পিল করা হেরিং থেকে মিটবলের রাজকীয় ভোজ
দীর্ঘ শীতের পর টাটকা ও তাজা ফসলের স্বাদ নিতে সুইডিশরা টেবিল সাজান রাজকীয় খাবারে। দুপুরের খাবারের মেন্যুতে থাকে আচারযুক্ত হেরিং মাছ, সুগন্ধি শাক দিয়ে নতুন আলু, স্মোকড স্যামন, চিজ পাই আর স্পেশাল মিটবল। আর ডেজার্ট হিসেবে থাকে স্ট্রবেরি ও হুইপড ক্রিমের স্পঞ্জ কেক। এই রাজকীয় ভোজের সঙ্গে চলে ঐতিহ্যবাহী গান আর বিশেষ পানীয় ‘স্ন্যাপস’।
বিশ্বের প্রাচীনতম জাদুঘরে উৎসবের ঢল
স্টকহোমের বিখ্যাত ওপেন-এয়ার মিউজিয়াম ‘স্ক্যানসেন’-এ প্রতি বছর মিডসামারের সবচেয়ে বড় আয়োজনটি বসে। হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটকের ভিড়ে মুখর থাকে এই প্রাঙ্গণ। লোকসংগীতের সুর, ঐতিহ্যবাহী রঙিন পোশাকের নাচ আর চমৎকার এক মেলার আমেজে মুখরিত হয় পুরো এলাকা। দর্শনার্থীদের সুবিধার জন্য এখানে সুইডিশ ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই ধারাভাষ্য দেওয়া হয়।
সীমানা পেরিয়ে লন্ডনের হাইড পার্কে
সুইডিশরা এমনিতে একটু শান্ত আর অন্তর্মুখী হিসেবে পরিচিত হলেও মিডসামারে তারা একদম বাঁধনহারা। আর এই হুল্লোড় শুধু সুইডেনেই সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডনের হাইড পার্ক বা নিউ ইয়র্কের মতো মেগাসিটিতে প্রবাসী সুইডিশরা মেতে ওঠেন ‘ফ্ল্যাশ মব পিকনিকে’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন শুধু সুইডিশরাই নন, বিভিন্ন দেশের হাজারো মানুষ শামিল হন এই আনন্দযজ্ঞে।
মিডসামার আসলে শুধু একটি উৎসব নয়; এটি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, দীর্ঘ শীতের পর আলোর উদযাপন এবং যান্ত্রিক জীবন থেকে ছুটি নিয়ে প্রিয়জনদের বুকে টেনে নেওয়ার এক অনন্য উপলক্ষ।
সূত্র: সিএনএন






