প্রাচীন মায়া সভ্যতায় ছিল দক্ষ ডেন্টিস্ট, মিলল প্রমাণ

প্রতীকী ছবি
দাঁতের ব্যথা হলে আমাদের একমাত্র আশ্রয় দন্তচিকিৎসক। কিন্তু নতুন এক গবেষণা দাবি করছে- আধুনিক ডেন্টাল ক্লিনিক, এক্স-রে কিংবা অবশ করার ওষুধ আবিষ্কারের বহু শতাব্দী আগেই মধ্য আমেরিকার প্রাচীন মায়া সভ্যতার মানুষ দাঁতের চিকিৎসায় বিস্ময়কর দক্ষতা অর্জন করেছিল।
প্রাচীন মায়াদের দাঁতে জেড (সবুজ মূল্যবান পাথর), পাইরাইট বা ‘ফুলস গোল্ড’সহ নানা রত্ন বসানোর নিদর্শন বহুদিন ধরেই প্রত্নতাত্ত্বিকরা খুঁজে পাচ্ছেন। এত দিন ধারণা করা হতো, এসব অলংকরণ ছিল সৌন্দর্য, সামাজিক মর্যাদা বা ধর্মীয় আচার পালনের অংশ। তবে নতুন গবেষণা সে ধারণাকে পালটে দিচ্ছে। অন্তত কিছু ক্ষেত্রে এই রত্ন বসানোর উদ্দেশ্য ছিল দাঁতের ক্ষয় বা ব্যথার চিকিৎসা।
গবেষকরা একটি বিশেষ মোলার বা পেছনের দাঁত পরীক্ষা করে রীতিমতো অবাক হয়ে গেছেন। তাঁরা দেখেছেন, সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একটি জেড পাথর বসানো হয়েছিল। গবেষণার সহলেখক ও মেক্সিকোর অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি অব ইউকাতানের ডেন্টাল অ্যানথ্রোপোলজিস্ট এলমা ভেগা-লিজামা বলেন, দাঁতে তৈরি করা গর্তটি এতটাই পরিষ্কার ও নিখুঁত যে এটি দক্ষ চিকিৎসা ছাড়া সম্ভব নয়।
পেছনের দাঁতে জেড, বদলে দিল পুরোনো ধারণা
দাঁতটি গুয়াতেমালার ফ্রান্সিসকো মারোকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুল ভুহ জাদুঘরের বিশাল সংগ্রহের অংশ। গবেষকদের ধারণা, এটি প্রাচীন মায়া নগরী কামিনালহুইউ অঞ্চলের এবং সম্ভবত খ্রিষ্টীয় ২৫০ থেকে ৯০০ সালের ক্লাসিক যুগের।
তাহলে অতীতের গবেষণা দাঁতের এইসব ‘কারুকাজ’ কে কেন নিছক ‘অলংকার’ মনে করতো? কারণ এর আগে পাওয়া অধিকাংশ রত্নখচিত দাঁত ছিল সামনের দাঁত, যা সহজেই চোখে পড়ে। তাই সেগুলোকে অলংকার হিসেবে ব্যাখ্যা করা সহজ ছিল। কিন্তু নতুন এই দাঁতটি পেছনের মোলার হওয়ায় সেটি দেখানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল—এমন ধারণা দুর্বল হয়ে যায়। বরং গবেষকদের মতে, এটি চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই বসানো হয়েছিল।
চমকপ্রদ তথ্য মিলেছে রত্নটি বসাতে ব্যবহৃত আঠা বা সিল্যান্ট বিশ্লেষণে। এতে পাওয়া গেছে ক্যালসিয়াম, ফসফেট, উদ্ভিজ্জ তেল এবং কখনো বিটুমিনের মতো উপাদানের উপস্থিতি। গবেষকদের মতে, এসব উপাদানে নাকি জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। দাঁতের ক্ষয় রোধেও সহায়ক হতে পারে এসব।
হাজার বছর আগের ‘ডেন্টিস্ট’-এর নিখুঁত কারিগরি
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে-সব মায়ার দাঁতে এ ধরনের ইনলে ছিল, তাদের দাঁতে নতুন করে ক্ষয় বা সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম। এমনকি এই প্রাচীন ফিলিংগুলো অনেক ক্ষেত্রে আধুনিক ফিলিংয়ের চেয়েও বেশি টেকসই ছিল। বহু শতাব্দী পেরিয়েও সেগুলো অক্ষত রয়েছে।
থ্রিডি টমোগ্রাফি ও ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করে গবেষকরা দেখেছেন, দাঁতে ছোট ড্রিলের মতো কোনো যন্ত্র দিয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে গর্ত করা হয়েছিল। দাঁতের ভেতরের অংশে ক্যালসিফিকেশনের প্রমাণও মিলেছে, যা ইঙ্গিত দেয়— রোগী জীবিত থাকতেই এই চিকিৎসা করা হয়েছিল এবং পরে তিনি আরও কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন।
যদিও গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখন পর্যন্ত একমাত্র এমন নমুনা। তাই পুরো মায়া সভ্যতার দন্তচিকিৎসা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সময় এখনও আসেনি। তবু এই আবিষ্কার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, প্রায় দেড় হাজার বছর আগেও প্রাচীন মায়ারা দাঁতের চিকিৎসায় এমন দক্ষতা অর্জন করেছিল, যা আজও বিস্ময় জাগায়।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি





