সাড়ে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর যা ঘটেছিল

১৯৬০ সালের ২২ মে ভয়াবহ ভূমিকম্পে লন্ডভন্ড হয় চিলি
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায় বুধবার শক্তিশালী দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এতে বহু হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল সাতের বেশি। এদিকে বাংলাদেশেও অল্প সময়ের ব্যবধানে কয়েকটি কম্পন অনুভূত হয়েছে। এগুলোতে বড় ক্ষতি করেনি, কিন্তু একটি প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে, যদি সত্যিই ভয়ংকর কোনো ভূমিকম্প আসে, তাহলে কী হতে পারে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৬০ সালের ২২ মে-তে। সেদিন পৃথিবী এমন এক ভূমিকম্প দেখেছিল, যা শুধু শহর বা দেশ নয়, পুরো গ্রহ সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামছে। চিলির দক্ষিণাঞ্চলের ছোট শহর ভালদিভিয়ার রাস্তায় তখন স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। আট বছরের সের্হিও বারিয়েন্তোস বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ সে একটি অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। শব্দটি যেন মাটির গভীর থেকে উঠে আসছে। গম্ভীর, দীর্ঘ আর ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো।
পর মুহূর্তেই পৃথিবী নড়ে উঠল।
রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো এমনভাবে দুলছিল যে তারগুলো একে অপরকে আঘাত করছিল চাবুকের মতো। বাড়ির চিমনিগুলো ভেঙে ছাদের ভেতরে পড়ে যাচ্ছিল। মানুষ দৌড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকাই কঠিন।
সের্হিও নিজেও মাটিতে পড়ে যায়। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার পড়ে। চারপাশের মাটি যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করছে। প্রায় দশ মিনিট সে নিজের পায়ের ওপর ভর করে দাঁড়াতে পারেনি।
সেদিনের সেই কম্পনের মাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৫। আজও এটি পৃথিবীতে যন্ত্রে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। পরে এটি পরিচিত হয় ‘গ্রেট চিলিয়ান ভূমিকম্প’ নামে।
বহু বছর পর সের্হিও নিজেই ভূমিকম্প বিজ্ঞানী হন। চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময় তিনি জানতে পারেন, ভূমিকম্পের সেই কয়েক মিনিটে তার শহর ভালদিভিয়া প্রায় ৩০ ফুট পশ্চিম দিকে সরে গিয়েছিল।
শুধু একটি শহর নয়, বদলে গিয়েছিল পুরো দেশ।
চিলির উপকূলের বিশাল অংশ প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে ঠেলে উঠে যায়। ভূমির অবস্থান পরিবর্তনের ফলে দেশের আয়তনও সামান্য বেড়ে যায়। হিসাব অনুযায়ী, বাড়তি ভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় দেড় হাজার ফুটবল মাঠের সমান।
একটি ভূমিকম্প যে একটি দেশের ভৌগোলিক আকার বদলে দিতে পারে, সেটি তখন অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ছিল।
এত শক্তি এলো কোথা থেকে?
বিজ্ঞানীরা পরে দেখতে পান, চিলির নিচে দুটি বিশাল ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলে শত শত বছর ধরে শক্তি জমা হচ্ছিল। প্রায় ৩৮৫ বছর ধরে আটকে থাকা সেই শক্তি একসঙ্গে মুক্তি পায় ১৯৬০ সালের মে মাসে।
ঘটনার আগের দিনও কয়েকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল, যেগুলোর মাত্রা ছিল প্রায় ৭। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে এমন ভূমিকম্পই বড় ধরনের দুর্যোগ সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু সেগুলো ছিল কেবল ভূমিকা। ২২ মে আসে মূল আঘাত।
পরে গবেষকেরা ধারণা দেন, এটি আসলে একক কোনো ভূমিকম্প ছিল না। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সংঘটিত কয়েকটি বিশাল ভাঙনের সম্মিলিত ফল ছিল এই মহাদুর্যোগ।
কম্পন এত শক্তিশালী ছিল যে চিলির দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা স্থায়ীভাবে নিচে দেবে যায়। কিছু জায়গা এতটাই নেমে যায় যে আজও জোয়ারের সময় সেগুলো পানির নিচে চলে যায়। ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পরও বিপদ শেষ হয়নি। বরং তখন শুরু হয়েছিল আরেকটি ভয়াবহ অধ্যায়। ভূমিকম্পের প্রায় ১৫ মিনিটের মধ্যে চিলির উপকূলে আছড়ে পড়ে বিশাল সুনামি। কোথাও কোথাও ঢেউয়ের উচ্চতা কয়েক তলা ভবনের সমান হয়ে যায়।
চিলির বন্দরনগরী তালকাহুয়ানোতে সুনামির জলোচ্ছ্বাস বন্দরে থাকা বড় বড় জাহাজকে তুলে এনে শহরের ভেতরে ছুড়ে ফেলে। বাড়িঘর, রাস্তা, দোকানপাট—সবকিছু মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। কিন্তু সুনামির যাত্রা সেখানে শেষ হয়নি। প্রশান্ত মহাসাগরের বুক চিরে সেই ঢেউ ছুটতে থাকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।
প্রায় ১২ ঘণ্টা পরে এটি পৌঁছে যায় হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে। সেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারান। আর প্রায় এক দিন পর আঘাত হানে জাপানে। জাপানের উপকূলীয় এলাকাগুলোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর সামোয়া, মার্কেসাস দ্বীপপুঞ্জ, ফিলিপাইন, নিউজিল্যান্ড, আলাস্কাসহ প্রশান্ত মহাসাগরের বহু অঞ্চলে সেই সুনামির প্রভাব দেখা যায়।
অর্থাৎ চিলিতে শুরু হওয়া একটি ভূমিকম্প পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের জীবনও কেড়ে নিয়েছিল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চিলিতে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ মানুষ নিহত হন। গৃহহীন হয়ে পড়েন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। হাওয়াই ও জাপানেও শতাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
তবে এই দুর্যোগ শুধু ধ্বংসই রেখে যায়নি। বিজ্ঞানও পেয়েছিল নতুন এক পথ। ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্টি হওয়া কম্পন তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতরের স্তরগুলো অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে। বাইরের আবরণ, ম্যান্টল, বাইরের কেন্দ্র, এমনকি ভেতরের কেন্দ্র পর্যন্ত সেই কম্পনের প্রভাব পৌঁছায়।
সেই সময় বিশ্বের বিভিন্ন স্থাপিত ভূকম্পন যন্ত্রে অসাধারণ স্পষ্টতায় ধরা পড়ে এই সংকেত। বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ গঠন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। এক হিসেবে এর মাধ্যমে গোটা পৃথিবী নিজের ভেতরের কিছু রহস্য মানুষের সামনে খুলে দিয়েছিল। মার্কিন ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ল্যারি রাফ পরে বলেছিলেন, এই ঘটনাই পৃথিবীর গভীর স্তরগুলোকে বোঝার নতুন পথ খুলে দিয়েছিল।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনও আসে এই ভূমিকম্পের পর। বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, একটি সুনামি হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিলেও সেটি গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় নেয়। অর্থাৎ দ্রুত শনাক্ত করা গেলে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব।
এই উপলব্ধির পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নত ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ক্রমে তৈরি হয় আধুনিক সুনামি সতর্কতা ব্যবস্থা। আজ প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে কোনো বড় ভূমিকম্প হলে যে সতর্কবার্তা কয়েক মিনিটের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তার পেছনে ১৯৬০ সালের চিলির সেই ভয়ংকর দিনের অবদান রয়েছে।
তাহলে কি ৯ দশমিক ৫-ই পৃথিবীর সর্বোচ্চ সীমা?
বিজ্ঞানীরা বলেন, এমন ভূমিকম্প অত্যন্ত বিরল, কিন্তু অসম্ভব নয়। পৃথিবীর কয়েকটি অঞ্চলে এখনো এমন ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ রয়েছে, যেখানে ভবিষ্যতে একই ধরনের বা কাছাকাছি শক্তির ভূমিকম্প ঘটতে পারে। তবে কবে ঘটবে, তা নির্ভুলভাবে বলার মতো প্রযুক্তি এখনো মানুষের হাতে নেই।
ভালদিভিয়ার সেই বিকেল আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। পৃথিবী বাইরে থেকে শক্ত ও স্থির মনে হলেও ভেতরে ভেতরে এটি সব সময় পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও শক্তি জমছে, কোথাও ভাঙন তৈরি হচ্ছে, কোথাও নতুন ভূখণ্ড গড়ে উঠছে।
একদিন সেই জমে থাকা শক্তি কয়েক মিনিটের মধ্যে মুক্তি পেতে পারে। আর তখন একটি শহর সরে যেতে পারে, একটি দেশের মানচিত্র বদলে যেতে পারে, মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ধ্বংস ছড়িয়ে দিতে পারে একটি ঢেউ।
১৯৬০ সালের ২২ মে পৃথিবী সেটিই দেখেছিল।
সূত্র:
ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস), ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নোয়া), ইউনেসকো, ন্যাশনাল সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইউনিভার্সিদাদ দে চিলে), এনসাইক্লোপিডিয়া
ব্রিটানিকা, ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও (এনপিআর)










